Search
[english_date] / [bangla_date] / [hijri_date] / [bangla_time]

কোন এক ফেরিওয়ালা’র কথা শোনাই…

মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি

আদ্যোপান্ত একজন মজার মানুষ। দুর থেকে দেখলে যে কেউ আঁতকে উঠবে!

‘লোকটা কী পাগল নাকি?’

সারা শরীরে ঝুলিয়েছেন নিত্য পণ্য সামগ্রীর পসরা! এমন কোন ফালতু জিনিস নেই সাথে। সবই রোজকার দরকারি বস্তু। স্নো-পাউডার, চুলের কাটা, চুলের ব্যান্ড, চিরুনি থেকে আরম্ভ করে খুসখুস কাশির বড়ি, কি নেই ঝুলিতে! কৃষকের জন্য রয়েছে-শাক,সবজির বীজ থেকে শুরু করে কিটনাশক, সার, পিঁপড়ে ও ইদুর মারার টোপ! আছে ঘর গৃহস্থের টুকিটাকি সহ নানান সামগ্রী।

গলায় একটা কালো ঝোলা। এই ঝোলাতেও মালামালে ভরপুর! এখানে পন্যসামগ্রী স্টক রাখা আছে। আরেক হাতে রয়েছে একটা হ্যান্ডমাইক।

নিজের শরীরজুড়ে এইভাবে ভ্যারাইটিজ জিনিসের সমাগম ঘটানো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর নাম মোঃ আমজাদ হোসেন। পেশায় তিনি একজন ব্যতিক্রমী হকার। যেন জীবন্ত কিংবদন্তী! কেননা, অন্য ক্যানভাসদের মতো শুধু মানুষকে বিরক্ত করে, জিনিস বিক্রির নামে দুটো পয়সা উপার্জনের ধান্দা নয়। এই কারবারীর ক্যানভাসার জীবন বড়ই মনোরম।

পথে পথে ঘুরে ঘুরে রোজ গান গেয়ে গেয়ে জীবন জীবিকার সন্ধানে মানুষটির ছুটে চলা!

আমাদের তো সবসময় হাট বাজারে যাওয়া সম্ভব হয় না। এমনও ঘটে- ১০ টাকার এক শিশি নিমের দাঁত মাজনী শেষ! ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে গাঁয়ের মানুষের বড়ই বিপদে পড়তে হয়। এই মানুষদের রোজ খেদমতেই ছুটে বেড়ান গায়ক আমজাদ হোসেন। এভাবেই সব দরকারি জিনিস গানে গানে ফেরি করে ছোট বড় সবার প্রিয় ক্যানভাসার হয়ে উঠছেন, গাঁয়ের তুখোড় গায়ক খ্যাত ফেরিওয়ালা মোঃ আমজাদ হোসেন। এমনকি গাঁয়ের মা বোনরাও দুর থেকে মানুষটির গান শুনে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসের খোঁজে ছুটে আসেন। যার যা কিছু দরকার কিনতে পারছে। কোন কিছু ঝুলিতে না থাকলে, আগাম অর্ডারও করে দিচ্ছেন অনাসায়ে। আরেকদিন আসলে মনে করে ঠিকই নিয়ে আসতে হয় আপুদের চাহিদা মাফিক জিনিস সব। অথচ এই যুগে প্রতিদিন কতই না হকারের মাইকের হাঁকডাকে ঘুম ভাঙে আমাদের। কিন্তু সকাল হলে এই মানুষটির মতো কোন গজলের সুরে এক প্যাকেট বিস্কুট, একটা রুটির প্যাকেট নিয়ে ঘুম ভাঙাতে আসে না কেউ। এই সাদামনের মানুষটির গানফেরির জীবনইটা শুধু বিরল!

১৫০০ টাকায় একাকি ভাড়া থাকেন। যখনই পরিবারের কথা মনে হয়, ছুটে যান নিজ গাঁয়ে। স্ত্রী-সন্তানের কাছে। সব খরচ বাদ দিয়ে রোজ ৫০০ টাকা আয় আছে। হাসিমাখা মুখে এতেই প্রশান্তি খুঁজে পান। রোদ বৃষ্টিতে ফেরি করে পন্য বিক্রির ব্যবসা দিয়েই চলছে সংসারের খরচ। একেক নতুন নতুন এলাকায় নতুন নতুন মানুষের কাছে হাজির হতে হয় নিত্য নতুন পণ্য সামগ্রী নিয়ে। যখনই গানের সুর তুলেন। মানুষ আপোষেই জমায়েত হয়ে যায়। ঘিরে থাকে মানুষটিকে। গান শোনালে মানুষ আরও গানের অনুরোধ করে। শুধু গান আর বেচাকেনাতেই থেমে থাকে না-গায়ক ও শ্রোতার কেনাবেচা! মানুষ ভালোবেসে চা বিস্কুটও খাওয়ায়। তবে, সিগারেটের প্রতিও ঝোঁক আছে একটু। নিজেও জানেন, নিকোটিন কতটা ক্ষতিকর ? গায়ক আমজাদ হোসেন বলেন-

‘মানুষকে বুঝতে দেই না, আমি এ্যাজমার রোগী। বেশি জোড়ে গান টান মারলে আমার শ্বাস কষ্ট হয়। ডাক্তার নিষেধ দিয়েছেন। গান গাও প্রাণ খুলে কিন্তু ওসব ধুমা খাওয়া ছাঁড়ো! ’ তবে মুখে হাসি রেখেই জানান দিলেন-

‘এখন থেকে চা আর পান খাবেন। সিগারেট গুড বায়!

প্রায় দেড় শতাধিক গানের ফেরিওয়ালা কিন্তু একটি অভিযোগ অত্যন্ত মলিন মুখে-

‘অনেকে এই গান গাও, ওই গান গান বলে আসর শুধু আসর জমায়। কিন্তু গানের আসর শেষ হলে ঔ মানুষগুলো ২ টা টাকার একটা লজেন্সও কিনে না! এতো কষ্ট করে গান শুনাই, কত মানুষ গান শুনে আস্তে কেটে পড়ে। কিচ্ছু কিনে না ভাই। তবু আমি দুঃখ করি না। বরং দেখে হাসি। শুনুক আমার বিনে পয়সার গান। এটাও তো কম পাওয়া নয়-

‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাবো, তোমাদেরই মন ভরাবো, শিল্পী হয়ে তোমাদেরই মাঝে, চিরদিনই আমি রবো …’

মোঃ আমজাদ হোসেনের গ্রামের বাড়ি শায়েস্তাগঞ্জ। ব্যবসার টানে থাকেন শমসেরনগর। গান গেয়ে জিনিস ফেরি করেই লোকটি নিজের সংসার চালাচ্ছেন। গায়কের তিন ছেলে। ওরা লেখাপড়া করছে। ছেলেরা মানুষের মতো মানুষ হবে, এই একটি স্বপ্নই সঙ্গীতপ্রিয় মানুষটির দেহমন জুড়ে শুধু আঁকিবুঁকি খায়। পরিবারের সুখের জন্যই তো শত কষ্ট বুকে চেপে রোজ মৌলভীবাজার টু হবিগঞ্জ ফেরিওয়ালা হয়ে গাইছেন-

জীবনের গান।

গান শুনে মানুষ ভালোবেসে দুটো জিনিস কিনছে। এই আনন্দ অনেক বড় প্রাপ্তী। দিনদিন ক্রেতার চেয়ে শ্রোতার সংখ্যাও বাড়ছে। সারাদিনের ফেরিওয়ালা তিনি। শুন্য ঝোলায় মহাসুখ জমা করে এভাবেই রোজ রাতে ফিরে আসেন আমজাদ হোসেন। এলাকায় প্রবেশ করে হাতে নেন গরম এক কাপ দুধ চা। চায়ের দেশের মানুষকে চা-ই যেন ভুলিয়ে দেয় সব ক্লান্তি। সারাদিনের পরিশ্রান্ত গলাও যেন একটু নিস্তার পায়!

মোঃ আমজাদ হোসেন কিন্তু শুধুই একজন ফেরিওয়ালা নন। লোকটা বাংলাদেশ রেলওয়েতে দৈনিক ভাতায় ২০০৭-২০১০ সাল পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করেছেন। অবসরে এখন ‘ফেরিওয়ালা’ জীবন বেছে নিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু সাদামনের মানুষটি বিশ্বাস করেন-

গান আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে। আর-

কাজ আমাকে শিখিয়েছে –
মাথা উঁচু করে বাঁচতে …

Facebook
Twitter
LinkedIn