অনেকে বলছে: আগেই ভাল ছিলাম
মারুফ আহমেদ: বিশেষ প্রতিনিধি
বিগত সরকারের সতেরটি বছরের বাজার খরচের লিষ্ট যদি কারও সংগ্রহে থেকে থাকে এখনকার বাজারের নিত্য পণ্যের দরদামের খসড়ার কাগজটাকে মনে হবে- শের শাহের যুগে আমরা চলে আসলাম কিনা!
শেখ হাসিনা সরকারের বিগত ৫ বছরের মাহে রমজানের সদাই পাতি কেনা ক্রেতারা এখন একটা দীর্ঘশ্বাস-ই ছাড়ছেন না। বাজারে এসে হাসিমুখে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারছেন। অনেকে আগের তুলনায় নিত্যপণ্য একটু বেশি-ই নিয়ে যেতে পারছেন পরিবারের জন্য।
এই সুখকর দৃশ্য রাজধানীর বিভিন্ন হাট বাজারের।
রমজানের প্রথমদিন থেকেই চলছে নতুন এক স্বস্থির কেনাকাটা। প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য বিগত তিন বছরের দামের প্রায় তিনভাগ কমে গেছে। প্রায় বেশির ভাগ জিনিসে। সে কারণেই এবারের রোজা ও ঈদের বাজার নিয়ে মানুষজন সন্তুষ্ট। কোন অসন্তোষ নেই। নেই কোন উচ্চবাচ্চ্য। ক্রেতাসাধারণকে বেশ উৎফল্লই দেখা যাচ্ছে রমজানের প্রথম থেকে।
অন্তবর্তী সরকারের জন্য এটা বিরাট এক সাফল্য বলা যায়। ভাবতেই অবাক হওয়ার মতো ঘটনা যা। তবে অসন্তোষ প্রকাশকারী যে নেই তা কিন্তু নয়। গুটি কয়েক জিনিসের দাম নিয়ে বেশ কিছু ক্রেতা সাধারণ ঠিকই চিৎকার চেঁচামেচি করছেন। লেবু বেশি ফলন হলে ২০ টাকায় ১ ডজনও পাওয়া গেছে। কিন্তু এখন অফ সিজনের কারণে রমজানের প্রথম দিকে লেবু প্রতি পিস বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকায়। আবার ৪ হালি বিক্রি করেছে ১০০ টাকায়। এখন হালি ২০ টাকায় নেমে এসেছে। এদেশে কোন পণ্যদ্রব্য দাম আকাশে উঠলে সেই জিনিসটা কেনার প্রতি ক্রেতার চাহিদা কমলেই জিনিসটির দাম দেখা যাচ্ছে আপোষে কমে যাচ্ছে! লেবুর বিষয়টি তরতাজা প্রমাণ।
ঠিক তরমুজের ঘটনাও একই। রমজানের প্রথমদিকে একটা মিডিয়াম সাইজের তরমুজ ৫০০ টাকার নিচে হাত দেয়া যায়নি। তরমুজের দাম এতটা গরম ছিল! ১০০০ টাকাও বিক্রি করেছে তরমুজ ব্যবসায়ীরা। এখন তরমুজ ছোট আকারের ৮০ থেকে ১০০ টাকা! দাম কোথায় নেমে এসেছে? ক্রেতারা তরমুজের দাম নিয়ে খুব খুশী থাকলেও ওজন দিয়ে তরমুজ বিক্রির ‘হটকারী বাণিজ্য’ বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন অনেকে।
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় আছে- পেয়াজ, আলু, টমেটো, তেল, রসুন, চিনি, আটা, গোশত, আদা, ডিম, মুরগি, চাল, ডাল, মাছ ও শাকসবজি। বাজারে গিয়ে যারা বলে আগেই ভাল ছিলাম তাদের মনে রাখা দরকার- আগে পেয়াজ আর কাচামরিচের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল? ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়ও বাঙালী পেয়াজের ঝাজে কাবু হয়েছে। সেই পেয়াজ এখন ৫ কেজি পাওয়া যাচ্ছে- ২০০ টাকায়! ১২০০ টাকার কাচামরিচ সবাই এখন খাচ্ছে ৪০ টাকায়! বাজারে ৫ টাকায়ও শান্তিতে কাচামরিচ কেনা যাচ্ছে। এটাই খুশির খবর।

আলুর কথা মনে আছে নিশ্চয়ই- ৭০ টাকা কেজির আলু এখন ৫ কেজি ১০০ টাকা! শান্তিবাগের আসাদ সাহেব, বছরখানিক আগে ২০০ টাকা দিয়ে তিনি ২ টা বড় টমেটো কিনেছিলেন একান্ত প্রয়োজনে। সেই টমেটো এখন সবজির ভ্যানে পাওয়া যাচ্ছে- মাত্র ১০ টাকা কেজিতে! ’ কেজি প্রতি রসুন ৭০ টাকা, চিনি ১২০ টাকা, আটা ৩০ টাকা, আদা ১০০ টাকা, ডিম রোজার প্রথমদিকে ১১০ টাকায় ডজন বিক্রি করেছে। এই ডিম এক হালি কিনতে হয়েছে ৮০ টাকায়! জাতি ভুলে যায়নি-একটা ডিম কিনেছি আমরা ২০ টাকায়?
মাছের দামে কোন পরিবর্তন নেই। তেলাপিয়া পাংগাস ১৮০-২০০ টাকা কেজি। ২২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরের মাছগুলোর দাম সেই আগের মতই আছে। শিল্পী খাতুন বললেন; ‘বাংলাদেশে সারাবছরই হাওর বিলের মাছ আসে। আর চাষের মাছ তো আছেই। আমরা মাছে ভাতে বাঙালী। মাছের দাম পানির দামে হওয়া উচিত। তেলাপিয়া মাছ ১০০ টাকা কেজি কিনেছি। এখন এক কেজি তেলাপিয়া ওজন দিলেই মাছের পেছনে আমাদের অন্য জিনিসের দাম খরচ হয়ে যাচ্ছে।’’
তাইজুদ্দিন মুরগির দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ‘ঈদকে একটা ধান্দা হিসেবে ধরে নিয়েছে বাজারের মুরগি বিক্রেতারা। দেখেন, এক মাস আগে ব্রয়লার কিনেছি ১৮০ টাকায়। এখন রোজা আর ঈদের উছিলা দেখিয়ে কেজিতে মুরগির দাম নিচ্ছে এরা ২০০ টাকা!
আফরোজা এসেছেন ভ্যানগাড়ি থেকে কাচা বাজার নিতে। তিনি বললেন; ‘ইউনুস সরকার আরও ৫ বছর থাকুক। হাসিনা আমাদের পেঁয়াজ ছাড়া রান্না শিখিয়ে গেছে। আমাদের কাঁঠালের বার্গার খেতে বলছে। এখন এসে দেখুক। আমরা ১০০ টাকার বেগুন ২০-৩০ টাকায় কিভাবে কিনে খাচ্ছি। জাতি এখন মিষ্টি কুমড়ার বেগুনি খায় না! বেগুন দিয়েই বেগুনী খায় ”
ইলিয়াস মাহমুদ চিনি কিনেছেন শরবতের জন্য। বললেন, ‘জুলাই আগষ্টের আগেও এদেশের মানুষ ১৫০-১৬০ টাকায় চিনি কিনে খেয়েছে। এখন তো শুনছি ব্রাজিল থেকে মাত্র ৬-৭ টাকা কেজিতে চিনি ইর্মোট করা হচ্ছে। সামনে চিনির দাম আরও কমে আসবে সেই আশা আমরা করতেই পারি।’
জনৈক সবজি বিক্রেতা বললেন, ‘আমরা কম পয়সার মালামাল আনতে পারছি বলেই শাকসবজির দাম কম রাখতে পারছি। পাইকারী বাজার ক্রেতাদের কথা চিন্তা করলে দেশের মানুষ সারাবছরই শান্তিতে জিনিস কিনে খেতে পারবে।”
তবে বাজারের অনেক বড় ব্যবসায়ী এখনও নিশ্চুপ। তাদের কাছে মনে হচ্ছে আগেই ভাল ছিলাম। পানির দামে সদাই বেচাকেনাতে যেন এদের মুখটা এখন মলিন। এলাকার মানুষ বাজারে এসে সস্তায় কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরছে। দেখে বুকটা ভরে উঠলেও একশ্রেণীর ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের কাছে কেন জানি দিনকে রাত আর রাতকে দিনই মনে হচ্ছে!
স্বস্তি ও আনন্দ ছাপিয়ে সিন্ডিকেট নিয়েও ক্ষোভ রয়ে গেছে ক্রেতা সাধারণের।
ইব্রাহিম সাহেব বললেন, ‘খেজুর দেখেন, ৪৫০ টাকা করে পুরো রোজা মাসে খেয়েছি। একটু কম দামের তো ছিল। আবার বেশি দামেরও ছিল। কিন্তু ৪৫০ টাকা মোটামোটি দামের খেজুর আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জন্য ঠিক দাম না। আর চালের বাজারে আসেন। সরকারকে এবার চালের দিকে নজর দিতে হবে। ২৬ কেজির ক্যাংগারু চালের বস্তা রাখছে ২২০০ টাকা! এটা ১৫০০ টাকা হওয়া উচিত। আর এমন কোন চাল কি পাবেন ৬০-৬৫ টাকার নিচে ? ৩ হাজার টাকার নিচে ৫০ কেজির কোন চালের বস্তা নেই। এমন অনেক পরিবার আছে এখনও মাসে ২ বস্তা চাল কিনে খেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অথচ ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। গরীব ও মধ্য বিত্তরা যদি এই প্রধাণ খাদ্যের পেছনে কষ্টের আয় শেষ করে ফেলে তো শাক সবজি মাছ গোশত কোথা থেকে খাবে। মানুষের আয় তো সীমিত। আমাদের আয় কি বাড়ছে। চালের সি ভাঙতে হবে। চালের দাম সর্বস্তরে ৩০-৩৫ টাকায় নামিয়ে আনতে পারলে এই সরকারের জন্য হবে আরও একটি মাইলফলক অর্জন।”
সিন্ডিকেটের কথা শুনে সব আক্রোশ নেমে আসল গোশতর দোকানে! দেশের ছোট বড় কসাইখানাগুলোতে ঈদের আগে চলছে গোশত কেনার হিরিক। দুলাল চৌধুরী বললেন, ‘‘এরা ওজনে কম দেয়, কেজিতে আধা কেজিই দিয়ে দেয় হাড়গোর আর উচ্ছিস্ট! দামের বিষয়ে মি.চৌধুরী আরও জানালেন, এই গোশত ব্যবসায়ীরাই কয়দিন আগে ৫৫০ টাকায় গোশত বিক্রি করেছে নোটিশ ঝুলিয়ে। এখন দেখেন ৭৯০ টাকা থেকে গোশতর কেজি কত?”
গোশতর সিন্ডিকেট খুব ধুরন্ধর। এরা মানুষের চাহিদার দিকে প্রবল নজর রাখে। কিন্তু দাম কমানো দিকে খেয়াল রাখতে ভুলে যায়। অনেকে অভিযোগ করছেন, এরা ইচ্ছাকৃতভাবেই দাম কমায়। আবার বাড়ায়। আর সবচেয়ে জঘণ্য কাজ করছে কম দামের অস্ট্রেলিয়ান ক্রস গরু কিনে আনে। যেই গোশতর কেজি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি হয় না। কিন্তু সেই গরুর গোশতর দাম নেয় না। তারা ভুয়া গোশত দিয়ে দাম নির্ধারণ করছে বাজারের সেরা দেশি ষাড় গরুর গোশতের। যা সম্পুর্ণ অন্যায়। অমানবিক।
বাজারে এখনও রয়ে গেছে তেল সিন্ডিকেট। যা চরম এক সুগভীর হটকারী কারবারী এরা। মানুষের নিত্যপণ্যের অধিকার ক্ষুন্য করে এই সিন্ডিকেট ১৭ বছর আগে যেই চরিত্র দেখিয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের পরেও এদের কোন পরিবর্তন নেই। কেজিতে যে তেল ১৩০ টাকায় দেয়া যায় সেটা এখন ২০০ টাকা ধরছে। ১৭০-১৮০ টাকায়ও সাধারণ মানুষ কষ্টের জীবনে তেল কিনে খেয়েছে রোজার আগে কয়েকটি দিন। আর ৫ লিটার তেল ৮৫২ টাকা থেকে ৯৮০ টাকা দিয়েও রমজানের বুট পেয়াজু আলুর চপ বেগুনীর শখ মেটাতে হয়েছে দেশের রোজাদার পরিবারগুলোকে। আর এখন ঈদকে কেন্দ্র করে বড় বড় তেল কোম্পানী গুলো তেলের সাথে সেই কোম্পানীর পোলাও চাল, চিনি, লবন, ইত্যাদি মালের সাথে পণ্য জুড়ে ডাকাতীর নমুনায় ক্রেতা সাধারণকে তেল কিনতে বাধ্য করছে এসব কোম্পানীর তেল সিন্ডিকেটাররা।
গোশত সিন্ডিকেট মাছ সিন্ডিকেট তেল সিন্ডিকেট আর চাল সিন্ডিকেটের দিকে ভোক্তা অধিকারকে অতি শীঘ্রই ধাবিত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন দেশের আপামর নাগরিক সমাজ।
ছবি : অভিযোগ নিউজবিডি২৪