নিজস্ব প্রতিবেদক

আগুন এর ভয়াবহতা বিশেষ করে বাংলাদেশে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গতকাল, ১৬ জানুয়ারী (শুক্রবার) উত্তরার আবাসিক ভবনে আগুনের কারণে দুই পরিবারের মোট ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে! ঘটনা মর্মান্তিক। এখনও যেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবার মনকে বিগলিত করে রেখেছে! ভিতরে আটকে পড়া মোনুষগুলোর আর্তনাদ দেশের কেউ মেনে নিতে পারছেন না। আধুনিক জীবনের নানান প্রযুক্তির ছোঁয়ার কথা বলা হলেও, বারবার আগুনের প্রতিবেদন লেখার সময়- দেশের এই একটি বিভাগের মানুষকে উদ্ধারে নেই কোন উন্নত প্রযুক্তির ছিটে ফোটা, এই কথাটিও লিখতে হয় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে।
বিশ্ববাসী দেখলো-বারান্দা থেকে একটি হাত নড়ছে! মানুষের অন্তিম মুহূর্তের শেষ প্রতিচ্ছবি ! বাঁচার শেষ লড়াই। কতই না স্বপ্নের সমাপ্তি হয়ে গেল গতকালের উত্তরায় আগুনের ভয়াবহতার কাছে সপে দেয়া সেই হাত নেড়ে নেড়ে বাঁচাও বাচাও বলা মানুষটির শেষ আকুতি!
দেশের কোথাও আগুন লাগলে মানুষ মারা গেলেই শুধু রাজউকের কথা উঠে আসে। ভবন নির্মাণের বিষয়ে সোচ্চার ও ক্ষোভে তোলপাড় হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সুরাহা তো হই না, বরং আরও নানান অনিয়ম উদাসীনতার নতুন নতুন তথ্য বেড়িয়ে আসে। তাও ডাক্তার আসার আগে রোগী মারা গেল’র মতো!
সেখানে অপেক্ষমান অনেক সাধারণ প্রতিবেশি ক্ষোভের সাথে জানালেন, পরিবারের সবাই ছাদে গেলে বাঁচতে পারতো? অনেকে বলছেন, আমাদের বাসার বারান্দায় আসে সেফটি ডোর। অনেকের লিফটের সাথে বাড়ির পেছনে সিঁড়ি, কেউ বলছেন- ফায়ার ফায়ার এক্সিট, ফায়ার এক্সিটিংগুইশারের কথা! এখন কথা হলো-রাজধানীর সুউচ্চ কয়টা ভবনে সরকারি রুলস মানা হচ্ছে? অথচ রাজউকের একটি বহুতল ভবন নির্মাণের আগে, প্ল্যান পাশের আগে, ডেভলপার কোম্পানীকে রাজউক কত কি নীতিমালা বেঁধে দেয়া হয়। ভবিষ্যতে রাজউককে ভুমিকম্পের মতো আগুনের বিষয়টি আমলে নিয়ে, ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ বিশেষজ্ঞ নিয়ে বসে আরও নতুন কিছু নিয়ম নীতি প্রতিটি ভবন মালিক ও ডেভলপারকে সুপারিশ করা একান্ত প্রয়োজন। মানুষ মারা যাবার পর যদিও আমরা বলছি, শহরের অধিকাংশ বাড়িওয়ালাই ভাড়াটিয়াদের ছাদে ওঠা এলাউ করেন না। অনেকে ছাদ বাগান করেন। অনেকে কাপড় শুকাতে চায় বলেও বাড়িওয়ালারা বিরক্ত বোধ করে থাকেন। আবার অনেক বাড়িওয়ালা নিরাপত্তাজনিত কারণেও ছাদের গেট তালাবদ্ধ রাখেন। সব ভাড়াটিয়াদের ছাদের চাবি কেন দেয়া হয় না? এটাও অনেকে বলছেন। তবে সবচেয়ে প্রধান বিষয়টি তালাচাবির নয়। ফ্ল্যাট মালিক সমিতি অথবা আবাসিক অনাবাসিক ভবনের মালিকরা ভবনে আগুন লাগলে কি ঘটতে পারে, এই বিষয়টি সম্পর্কে মোটেও অবগত নন। সচেতন নন। এখন বাড়িতে বাড়িতে গ্যাস সরবরাহ নাই। যাদের লাইন আছে গ্যাসের ফোর্সও কম আসে। শহরের বেশিরভাগ নাগরিক এখন সিলিন্ডার এলপিজিতে অভ্যস্ত। এই সিলিন্ডারের ভয়াবহতা সম্পর্কে কয়টা বাসা বাড়ির বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে আমরা আলোচনা করতে দেখি? শুধু আগুনে ভস্ম হয়েই মানুষ মারা যায় না, আমরা অনেকেই জানি না যে, প্রকোট ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পারলেও মানুষ মারা যায়। অপরিকল্পিত নগরায়নে ছাদবাগান করে শাক সবজি খেতে ছাদ তালা মেরে মানুষ মারার নীতি পরিহার করা উচিত কিছু অসচেতন বাড়িওয়ালাদের। পৃথিবীতে মনে হয় বাংলাদেশই প্রথম হবে যে দেশে আগুন নিভাবে নেই তেমন কোন উন্নত প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন! অগ্নিকান্ড কমানোর বিষয়ে সবার সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। আগুন লাগবে আর ফায়ারসার্ভিস আসবে উদ্ধার করতে, ব্যস আগুন নিভে যাবে-এই ধরণের ভ্রান্ত ধারণা পরিহার করতে হবে। তবে এটাও ঠিক ফায়ার ফাইটারদের বাহিরের দেশের উন্নত ট্রেইনার এনে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। উন্নত ফায়ারস্টেশনের খুব প্রয়োজন এই শহরের। কেননা-উন্নত বিশ্বে বড় বড় দালানে আগুন লাগে, মানুষ পুড়ে কয়লা হয় কতজন? অথচ এদেশে ভয়াবহ আগুন নিয়ন্ত্রণ ও মানুষজনকে নিরাপদে নিতে এদেশের ফায়ারসার্ভিস ও সেচ্ছাসেবকদের কতটা বেগ পেতে হয়- উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নং রোডের ৬ তলা ভবনের আকস্মিক আগুন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো? দেশের আগুন নেভানোর প্রক্রিয়্ নিয়েও নাগরিক জনতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, আমাদের ফায়ারসার্ভিস এখনও সেই মান্ধাতা যুগে পরে আছে। শুধুমাত্র বিশালাকার লম্বা পানির পাইপ ছাড়া এরা সাথে আর কিছু নিয়ে আসে না। নাই প্রযুক্তি নির্ভর গ্রিল কাটার মেশিনারিজ। না আছে বহুতল ভবনে রাস্তা থেকে উঠে আগুন নেভানোর কোন সুব্যবস্থা! ভাবতেও অবাক লাগে, ফায়ারফাইটারদের অগ্নিকান্ডের সময় দুর্ঘটনা কবলিত স্থানে যেতে নেই কোন জীবন রক্ষাকারী সাজ সরঞ্জাম! আমাদের ফায়ারফাইটারদের জীবনও যে কোন দুর্ঘটনায় ঝুঁকিমুক্ত হতে পারেনি এখনও। অপ্রতুল অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে আহত মানুষ উদ্ধার করা খুবই কষ্টকর। অনেক ফায়ার ফাইটার নিজেরাই বলছেন, আমাদের সক্ষমতা বহুতল ভবন পর্যন্ত পৌঁছুতে আরও সময় লাগবে। গতকালকের ৬ তলা ভবনের আগুনই আমাদের সেই দৈনতা ফুটিয়ে তুলেছে হতভাগা পরিবারটির মৃত্যুর শিরোনাম হয়ে!
আর হেলা নয়, দেশের বসত বাড়ি, সু উচ্চ দালান, স্কুল কলেজ, উপাসনালয়, ভার্সিটি, রেস্টুরেন্ট, বস্তিঘর, শপিংমল সবখানে আগুনের সুত্রপাত নিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। আর ডেভলপারদের প্রপার বিল্ডিং কোড মেনে ফায়ার এক্সিট, ফায়ার এক্সিটিংগুইশার বাধ্যতামূলক করলেই হবে না, সরকারি উদ্যোগে চেকিং সিসটেমের আওতায় আনতে হবে। আর প্রতিটি বাসাবাড়িতে যথাসম্ভব বারান্দার গ্রিলে একটি ছোটমতো পকেট গেইট বা এক্সিট দরজা সংযুক্ত রাখতে হবে। এটাও বাধ্যতামূলক করা উচিত।
উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের শুরুতেও নারায়ণগঞ্জে একই পরিবারের ৫ জন রেল দুর্ঘটনায় মারা যান। এ বছরও শুরুতে একই পরিবারের জলজ্যান্ত ৬ জন আগুন ও আগুনের ধোঁয়ায় শ^াস কষ্টে মারা গেলেন। যা সত্যি হৃদয়বিদারক ও অসহনীয় মর্মান্তিক ট্রাজেডী হয়েই থাকবে।