মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি
জাতীয় কবিতা পরিষদের নিয়মিত কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের ৫১তম আয়োজন ২১ অক্টোবর, মঙ্গলবার, বিকাল ৫ টায়, ২৬ ইস্কাটন গার্ডেন রোডের ‘কাজল মিলনায়তন- এ অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ অক্টোবর ছিল বাঙালির দ্রোহ, প্রেম ও প্রতিবাদের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র ৬৯তম জন্মদিন।
কবিতা পরিষদের ৫১তম নিয়মিত কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানটি জাতীয় কবিতা পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহএক নিবেদন করা হয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বিশিষ্ট লেখক-আইনজীবী মোঃ আসাদুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র ছোট ভাই চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. সাইফুল্লাহ্।
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হানের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্যে মোহন রায়হান বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে দুটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদ, এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিল রুদ্র। তৎকালীন পাকিস্তানী শাসন-শোষনের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল কবির বিরোধী চেতনাবোধ। রুদ্র ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। রুদ্র ছিল আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওর সঙ্গে অনেক স্মৃতি-বিস্মৃতি আছে, অনেক দুঃখ বেদনা-বিরহ, আনন্দ ও সুখের স্মৃতি রয়েছে। তাঁর জন্মদিনকে স্মরণ করে আজকের অনুষ্ঠানটি করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। তাঁর জীবনও বৈচিত্রময়, আন্দোলনমুখর এবং সংগ্রামী জীবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন তিনি। আমি ও আসাদ সহযোদ্ধা ছিলাম। সেই সময় অবৈধ ক্ষমতার দখলদার সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আসাদ অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। এছাড়াও তিনি একজন একজন বিশিষ্ট লেখক। ভার্চুয়াল জগতে ‘মাধবী’ সিরিজের তিনি একজন জনপ্রিয় লেখক। এ সিরিজে দেশে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি. প্রেম-রিহ সমস্ত কিছু উঠে আসে। আমি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে আসাদের নিমগ্ন ভক্ত পাঠক।
অনুষ্ঠানে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’কে নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের সম্মানীয় অ্যাটর্নী জেনারেল ও বিশিষ্ট লেখক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, আমার জীবনের প্রমম প্রেম রাজনীতি এবং শেষ প্রেমও রাজনীতি। এই রাজনৈতিক জীবনের ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতন রয়েছে। এই ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখেছেন, উৎসাহ যুগিয়েছেন তাদের মধ্যে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও কবি মোহন রায়হান অন্যতম। ক্লাস এইটের যখন ছাত্র তখন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতাটি আমার রক্তে আগুন জে¦লে দেয়। কবি মোহন রায়হানের রাউফুন বসুনিয়াকে নিয়ে লেখা কবিতাটিও আমাকে ভীষণভাবে আন্দোলিত করে। মোহন রায়হানকে অনুসরণ করতে পেরে এবং তাঁকে নেতা হিসেবে পেয়ে রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় কবিতার প্রতি একটা মোহ জন্ম নেয়। চলছি চলছি হঠাৎ প্রেমে পড়ে গেলাম। নাম তার মাধবী। তাকে প্রথম যখন প্রেমের কথা বলি, জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই।’ তাকে মুগ্ধ করার অন্য কোনো পন্থা ছিল না আমার, রাজনীতির প্রেম যখন আমি মগ্ন তখন একজন নারীকে কীভাবে আকৃষ্ট করা যায় তার জন্য আমি রুদ্রের কাছে ফিরে গিয়েছিলাম। আমি নিজেকে রাজনৈতিকভাবে শাণিত করার জন্য রুদ্রের কাছ থেকে সাহস ধার করেছিলাম। ঠিক একইভাবে প্রেমে পড়ে আমার জীবন জলাঞ্জলী দেওয়ার জন্যও রুদ্রের কাছে থেকে ভালবাসা ধার করেছি। তখনও বুঝিনি যে প্রেম মানে কারো কাছে আমার বন্দি থাকতে হবে, শৃঙ্খল থাকতে হবে। সেই শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে আমি রুদ্রের সহযোগিতা নিয়েছিলাম। রুদ্রেরে কাছে আমি অনেক ঋণী। আমি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় বিশ ঘন্টা কাজ করি। কাজ করতে করতে যখন মাথা জ্যাম হয়ে যায় তখন রুদ্রের কবিতা পড়ি বা হেলাল হাফিজের কবিতা পগি এবং বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের লেখা পড়ার চেষ্টা করি। আমি বিশ্বাস করি-কবিতা, সাহিত্য ও গান যে কোনো ক্লান্তি দূর করার জন্য এর থেকে বড় টনিক বা ম্যাজিক আছে বলে আমার মনে হয় না। আমি যা লিখি সেটা কবিতা না, সাহিত্য না। সেটা আমার মনে কিছু অভিব্যক্তি। তবে আমি সময় পেলে তো হবে না, লেখার সময় পেতে হবে। আমি যখন ট্রাফিক জ্যামে বসে আছি অথবা দীর্ঘ প্লেন যাত্রায় থাকি সে সময়ের বেশিরভাগ সময়ে ‘মাধবী’ লেখা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় রুদ্রের কবিতার মধ্য দিয়ে যে কবিত্বকে গ্রহণ করেছিলাম সে কবি সত্তার মধ্যে অধিকাংশ সময়ই রুদ্র থাকে। রুদ্র আমার কাছে গর্বের, রুদ্র আমার কাছে অহংকারের। রুদ্র ততদিন বেঁচে থাকবেন যতদিন এই শহরের মানুষ প্রেমের স্বপ্ন দেখবেন, দ্রোহের স্বপ্ন দেখবেন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁর সাহিত্যে শব্দের ব্যবহার এমনভাবে করেছেন, এমন শব্দ চয়ন করেছেন যা পড়লে শরীর, মন ও রক্তে মাতম ধরিয়ে দেয়। রুদ্র বেঁচে থাকবেন, রুদ্র মরে না, রুদ্ররা মরে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র ছোট ভাই চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. সাইফুল্লাহ বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল রুদ্র ভাই ডাক্তার হবেন। কিন্তু তিনি ডাক্তার না হয়ে সাহিত্যকেই বেছে নিলেন। এসএসসি’তে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে খুব ভালো ফলাফল করেছিলেন। হঠাৎ এইচএসসি’তে গিয়ে তিনি বিজ্ঞান থেকে কলা অনুষদে ভর্তি হলেন কবি হবেন বলে। সাহিত্য তাকে এমনইভাবে আঁকড়ে ধরেছিল যে, তিনি সাহিত্য ছাড়া অন্যকিছু বুঝতে চাইতেন না। কবিতা লিখতে শুরু করলেন। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে কবি হিসেবে পরিচয় করাতে পেরেছিলেন। ফলে বড় ভাই ডাক্তার না হওয়ার কারণে আমার উপর ডাক্তার হওয়ার দায়িত্ব পড়ে।’
কবিবন্ধু তুষার দাশ বলেন, সত্তর দশক ও আশির দশকে রুদ্রের সাথে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কিছু নেই। শ্রদ্ধা জানানো একধরনের প্রতারণা। কারণ বন্ধুরা বন্ধুদের প্রতি কখনও শ্রদ্ধা জানায় না। বন্ধুরা ভালোবাসে। সেই ভালোবাসা জানানোর জন্য আজ এসেছি। সেই সময় রুদ্রের সাথে যারা ভালো কবিতা লিখেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আজও বেঁচে আছেন। কিন্তু রুদ্র এমন একটা আবহ তৈরি করতো, এমন একটা নৈকট্য তৈরি করতো, এমন একটা স্বজন বোধের জায়গা তৈরি করতো যে রুদ্রকে ভুলে থাকা মুশকিল। লালনকে নিয়ে যেমন মেলা হয় আধুনিক যুগে রুদ্রকে নিয়েও মেলা হয়। বাংলাদেশে আর কোনো কবিকে নিয়ে মেলা হয় না। অর্থাৎ সে একটা পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিল। এই পরিবেশের ভিতরটার অর্থটা হচ্ছে এই যে- মানুষের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব তৈরি করা এবং খুব সহজেই মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়া, ছড়িয়ে পড়া। এটা ছিল রুদ্রের শিখরস্পশী সাফল্য, যা ভাবা যায় না। রুদ্রের মধ্যে সারল্য ও মাতৃত্বের মমতা ছিল। তিনি তার বন্ধুদের সঙ্গে ধ্যানে নিমগ্ন হতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ক পয়ত্রিশ বছর বয়সে জীবনের অন্তিম ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন।
আলোচনার পর কবি মোহন রায়হান, কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, কবি তুষার দাশ, কবি লিলি হক, কবি গোলাম শফিক, কবি মনুজুরুর রহমান, কবি কামার ফরিদ, কবি শ্যামল জাকারিয়া, কবি এবিএম সোহেল রশিদ, কবি নূরুন্নবী সোহেল, কবি তপন রায়, কবি ক্যামেলিয়া আহমেদ, কবি আসাদ কাজল, কবি দীরাজ মাহমুদ, কবি ইউসূফ রেজা, কবি জামিল রুবি, কবি শাহীন চৌধুরী, কবি কাব্য রাসেল, কবি মিঠু কবির, কবি তাসকিনা ইয়াসমিনসহ সত্তর জন কবি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন।
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন ছায়ানটের ছাত্রী, সাওল হার্ট স্টোরের পুষ্টিবিদ মিশু দাস, কবি ফারহান উদ্দিন। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র কবিতা আবৃত্তি করে শোনান-কবি মেহেদী হাসান, কবি মনিরুজ্জামান পলাশ, অনন্যা মাহমুদ ও ইশরাত ঝিমি।
খুব মনোরম সুন্দর অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন কবি মনিরুজ্জামান ও কবি শিমুল পারভীন।
