মারুফ আহমেদ এর বিশেষ প্রতিবেদন

মেট্টোরেল শহরের জনপ্রিয় গণপরিবহন। দৈনিক প্রায় ৪ লাখ যাত্রী নিয়ে ঢাকা শহর জুড়ে চলছে বাহনটি। মেট্টোরেল প্রকল্প বর্তমানে সড়ক ও মহাসড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। স্বপ্নের মেট্টোরেল আধুনিক উন্নয়নে নতুন মাত্রা পেলেও, সদ্য জীবনবিনাশী একটি দুর্ঘটনা দেশবাসীর কাছে মেট্টোরেল যেন এখন এক অপবাদনামা! শুধু অপঘাতে মৃত্যু আর মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে। আর পুরো রাজধানী যেন মৃত্যুফাঁদ। কখন কার ডাক আসে। নেই স্বাভাবিক সুস্থ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। এই শহরের মানুষগুলোর পদে পদে ভয় আর উৎকণ্ঠায় কাটে পেশাগত জীবন। ঢাকায় ছুটোছুটি! অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে প্রথম কাতারের দেশ হবে, নিশ্চিত। ২৬ শে অক্টোবর (রবিবার), দিনটি আমাদের সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। একজন পথচারীর নিরব প্রস্থানে সারা দেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া! বিশ্ব জেনে গেল, নাগরিক সুরক্ষায় আমরা কতটা পিছিয়ে আছি। দুর্নীতির কাছে টেকসই উন্নয়ন পুরোপুরি পরাস্ত। যার খেসারত দিচ্ছি আমরা আম জনতা খ্যাত নাগরিক সমাজ। বেঘোরে প্রাণ দিতে হচ্ছে রোজ সাধারণ নাগরিকের। সকালে কর্ম ব্যস্ততায় ছুটে চলা মানুষটি স্ত্রী সন্তান বাবা মাকে বিদায় দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে বলতে পারছে না, কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা? ঢাকা শহর এতোটা অনিরাপদ শহর হয়েছে। মৃত্যু তো অবধারিত। তবু এদেশের মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করেন। এটাও আমাদের মৌলিক অধিকার। সরকারি অবহেলার কাছে নিজের জীবন বিলিয়ে আবুল কালাম দেখিয়ে দিয়ে গেলেন, এই দেশে অপমৃত্যু কতটা ট্রাজেডীর …
একটি পরিবারের প্রিয়জন হারানো সদস্য ছাড়া কেউ বুঝবে না, এই দুঃখজনক চিত্রটি কতটা নাজুক। আগুনে ঝলসানো মৃত্যু, লঞ্চ ডুবি, ট্রেন দুর্ঘটনা, বিমান দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, সদ্য মেট্টোরেলের ‘বিয়ারিং প্যাড’ খুলে পড়ে মৃত্যুসহ-কত অপঘাত,অপমৃত্যুর কথা টানবো? মৃত্যু এখন দেশের এক কালো অধ্যায়! অবহেলা-গাফিলতি জনিত মৃতুর মিছিল কবে থামবে। কেউ তা জানে না। আর জানে না বলেই, এই নগর জীবনে পথ চলতে পিছু এক অজানা ভয় নিয়ে চলতে হচ্ছে সবার।
সরকারের কারও জন্য মাথা ব্যথ নেই। যে যার মতো চলছে চলুক। এই এক নিয়মের আবর্তে চলছে সবার বেঁচে থাকা। সাধারণ মানুষ মরে লাশ না হলে, ভাইরাল না হলে, টনক নড়ে না কারও! প্রশাসনের ঘুম তো আরও কঠিন। সুড়সুড়িতেও কাজ হয় না ! মেট্টোরেলের ফার্মগেট এলাকায় পিলার থেকে ‘বিয়ারিং প্যাড’ খুলে বেচারা আবুল কালামের মাথায় পড়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর খবর ভাইরাল না হলে, এত হাজার কোটির মেট্টো প্রকল্পের দুর্নীতির ত্রুটিপূণ কারিগরি সিস্টেম সবার অজানা’ই থেকে যেত।
ভাবতেও অবাক লাগে, একই রুটে এর আগেও ‘বিয়ারিং প্যাড’ (২০২৪ এর ১৮ সেপ্টেম্বর) খুলে পড়ার ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন কর্ণপাত করেনি। নেয়া হয়নি কোন প্রকার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। যেই গাফিলতির বলি হলেন, অবশেষে আবুল কালাম। ২০২৪ সালে ‘বিয়ারিং প্যাড’ খুলে পড়ার ঘটনায় তখন কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সে কারণেই হয়ত কমকর্তাগণ বিষয়টি ধামাচাপায় ছিল। খবরে প্রকাশ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বরত আব্দুল বাকী মিয়া’র নের্তত্বে ৬ জন (নিজস্ব) ও ৪ জন (পরামর্শক) নিয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মেট্টোরেল চলাচলের কারেণে মেট্টোর কংক্রিটের কাঠামো (গার্ডার) বিচ্যুতি এবং সংকোচন ঘটতে পারে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পয়েন্টে ‘বিয়ারিং’ পরীক্ষা ও ‘ড্রোন’ দিয়ে ছবি সংরক্ষণের পরামর্শ দেয়া হয়। এমনকি, প্রতিটি পিলারের নিচে ‘বিয়ারিং’ আটকে রাখার জন্য ইস্পাতের কাঠামো বা ফ্রেমের ভেতরে যুক্ত রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের কথা বলেছে উক্ত কমিটি।
কেন তখন অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হলো না?
কারা, কি কারণে, স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়েছেন?
এবার নতুন তদন্তের স্বার্থে,পুরনো কাসুন্দি-ঘাটার প্রয়োজন আছে। কেননা, গোড়ায় গলদ থাকতে পারে, এবং সেই ভুলচুকের মূল উৎপাটন দরকার।
বিগত ১ বছরের মাথায় গণপরিবহনটি মানুষের যাতায়াত সুবিধার কারণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রোজ মেট্টোতে যাত্রীদের চাপও সেইসাথে বাড়তে থাকে। একটা ঘন্টা মেট্টোরেল বন্ধ রাখা হলে, মানুষের কি যে ভোগান্তি শুরু হয়, তা আবুল কালামের মৃতুজনিত কারণে মেট্টোরেল সাময়িক বন্ধ থাকার সময় দেখা গেছে।
নেটিজেনরা কি বলছেনঃ
সাবেক সরকারের রাজনৈতিক ‘গেমবাজীর’ একটা অংশ ছিল এই মেট্টোরেল প্রকল্প! ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও প্রথম মেট্টোরেল চালু করে, আওয়ামীলীগ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার হয়েছে। তড়িঘড়ির ফল যে অনিরাপদ সে বিষয়ে কারও কোন সন্দিহান নেই। মেট্টোতে মতিঝিল থেকে যাত্রী নেয়া শুরু হলো ২০২৩ সালের শেষ দিকে। মন্ত্রণালয় সূত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ফলাও করতে শেখ হাসিনা সরকারের চাপেই মেট্টোরেল চলাচলের অনুমোদন দেয়া হয়। যদিও দেশবাসীকে দেখানো হয়েছে, পরীক্ষামূলক যাত্রী নিয়ে নিরাপদে মেট্টোরেল চলছে ঢাকার বুকে!

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমতঃ
উত্তরা থেকে মতিঝিল রুটে মেট্টোরেল চালু হয় মূলতঃ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। নিরাপত্তা নিরীক্ষা (যাচাই রিপোর্ট) ছাড়া। এত বড় একটি প্রকল্প চালু করা হলো, উপযুক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। যা ছিল প্রহসনের সামিল ! এমনকি ‘ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষ (ডিটিসি) কে পাশ কাটিয়ে। মেট্টোরেল আইন ও মেট্টোরেল বিধিমালা অনুযায়ী মেট্টোরেল নিরাপত্তা ও কারিগরি সংক্রান্ত কোন প্রতিবেদনও ডিটিসি-কে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ এসেছে। আগামীতে প্রকৌশল ও নিরাপত্তা বিভাগের গবেষকদের নিয়ে বিশেষ একটি প্যানেল গঠন করা জরুরি। কেননা এখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। শুধু দুর্ঘটনা চিহ্নিত পয়েন্টে ‘বিয়ারিং প্যাড’ ঝুঁকিমুক্ত করলে হবে না। ভায়াডাক্ট বা উড়ালপথ ও পিলারের মধ্যে সংযোগ করা ‘বিয়ারিং প্যাড’ ও অন্যান্য ‘ঝুঁকিপূণ’ মেট্টো এরিয়া তৃতীয় পক্ষ দিয়ে পুর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিরীক্ষন করতে হবে। জাতি হিসেবে আমরা হতভাগা না সৌভাগ্যবান, বুঝতে পারছি না? মেট্টোর ‘বিয়ারিং প্যাড’ পড়ে আবুল কালামের মৃত্যুর ২৪ ঘন্টা পেরোয় না। ২৭ অক্টোবর (সোমবার) নারায়নগঞ্জে, মেট্টোরেল সম্প্রসারণকে এদিকে যৌক্তিক দাবি মনে করছেন রেলপথ সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম । সচিব বলেন, স্যাটেলাইট শহর বা ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলা নারায়নগঞ্জে মেট্টোরেল বাস্তবায়নের দাবি একেবারেই যৌক্তিক। বিদেশে রাজধানীর পাশের শহরগুলোতে মেট্টোরেল সংযোগের কথাও উল্লেখ করেন রেলপথ সচিব। নারায়নগঞ্জবাসীদের স্বপ্নের মেট্টোরেলের আকাঙ্খা পূরণ হোক। দেশবাসী অবশ্যই হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকে সাধুবাদ জানাবে, যেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য পাবে। এমন উন্নয়ন জাতি চায় না, যেখানে দুনীতির আধিক্য থাকে। ২০১২ সালে মেট্টোরেল প্রকল্পের কথা যদি বলি, প্রথমে এর ব্যয় ধরা হয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ ব্যয় দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। আর এই প্রকল্পে জাপানী আন্তর্জাতিক সহযোগি সংস্থা (জাইকা) বাংলাদেশকে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। তারপরও এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতি কি.মি মেট্টোরেল পথ নির্মাণ ব্যয় দেখানো হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা। মজার বিষয়, উন্নয়ন তো ঠিকই হয়েছে, মেট্টোরেল নির্মাণ ব্যয়ে বাংলাদেশ আশে পাশের সব দেশকে পেছনে ফেলে ডিজিটাল বাংলাদেশের খেতাবে ভূষিত হয়েছে ! বেচারা আবুল কালাম, আমাদের এমন’ই এক উন্নয়নের অংশীদার! নিজের জীবনের বিনিময়েও যদি জাতিকে তিঁনি ক্ষমা করেন…
যুবক আবুল কালামের স্ত্রী আইরিনকে ডিএমটিসিএল মেট্টোরেলে চাকরি দিবে বলে আস্বস্ত করেছে। উপদেষ্টা বলছেন, পরিবারের একমাত্র ভরনপোষনকারী আবুল কালামকে ৫ লাখ টাকা দেয়া হবে। এদিকে রুল জারি করেছে হাইকোট: নিহত কালামের ২ সন্তানের ভরনপোষণে নিহতের পরিবারকে ডিএমটিসিএল ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ৩০ দিবসের ভেতর ক্ষতিপূরণ ও স্থায়ী চাকরি দিতে বলা হয়েছে। কালামের মৃত্যু বিশ্বকে দেখিয়ে দিলো- স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতার বিষয়টি এড়িয়ে গেলে, কি ঘটতে পারে?
একটি ভারী ট্রেন যাতায়াতের নিচে কম্পনসৃষ্ট স্থানে বিয়ারিং প্যাডের অবস্থান। সৃষ্ট কম্পন, তাপমাত্রার আধিক্য ও কারিগরি ত্রুটির ফলে ‘বিয়ারিং প্যাড’ ওপর থেকে ছিটকে পড়তেই পারে। ২৬ অক্টোবর থেকে সরকারিভাবে সে কথাই বলা হচ্ছে। কিন্তু আর কখনও যে খুলে পড়বে না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। শুধু একটি পিলারের নিচে রক্ষাকবচ জুড়ে দিলে কি বিপদমুক্ত হওয়া সম্ভব? উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান স্বয়ং অবগত আছেন, মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্ত মেট্টোরেলের জন্য পিলার আছে ৬২০ টি। আর সব পিলারের নিচে ‘বিয়ারিং প্যাড’ লাগানো আছে ২ হাজার ৪৮০ টি। প্রায় ১০০ কেজির ভারী একটি বস্তু এত উঁচু থেকে কারও মাথায় পড়া মানে যে ‘স্পট ডেথ’ তা নিহত আবুল কালাম-ই কিন্তু জলজ্যান্ত উদাহরণ! কথাটা সবার ভুলে গেলে চলবে না। যদিও দুর্ঘটনার পর থেকে মেট্টোকে ঘিরে একটু শঙ্কা তৈরি হয়েছে । এটাই স্বাভাবিক। তবে গণবান্ধব বাহন হিসেবে মেট্টোরেল কিন্তু ইতিমধ্যেই সবার আস্থা অজনে সক্ষম হয়েছে। সামনে হয়ত আরও এগিয়ে যাবে। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আমরা কখনও ভুলব না নিহত যুবক আবুল কালামকে। অনাকাঙ্খিত এই শোকগাঁথা বুকে ধারণ করে, মেট্টোরেলকে বয়ে নিতে হবে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রকৃতধারা। আগামীর উন্নয়নের অগ্রযাত্রা।
লেখক :
সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, নির্মাতা