Search
[english_date] / [bangla_date] / [hijri_date] / [bangla_time]

লংলা ডানকান টি গার্ডেনে বানরের উপদ্রব-শঙ্কায় বাগান কর্তৃপক্ষ

মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি

তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা নিয়ে এতটা ভয়ের কিছু নেই। প্রয়োজন পরিবেশ সম্মতভাবে বানরের জন্য অভয়ারণ্য গড়ে তোলা। লোকালয়ে বানর কেন আসে? এটা থেকেই বোঝা যায়-ঐ চা বাগানের বানরগুলো প্রচণ্ড ক্ষুধার তাড়নায় জর্জড়িত।

নয়নাভিরাম লং লা টি গার্ডেন। সবার জন্য উন্মুক্ত। কুলাউড়া টিলাগাঁও পেরিয়ে লালপুর-নয়াবাজার এলাকায় চা বাগানটির অবস্থান। অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় চা বাগানটি। লংলা ডানকান ব্রাদার্স টি গার্ডেন নামে সুপরিচিত বাগানটি এখনও বৃটিশ নিয়মেই পরিচালিত হচ্ছে। বাগানের ইতিহাস থেকে জানা যায়- আড়াইশো বছর আগে বৃটিশরা এই বাগান চালু করে। ওরা বলতো-‘গাছ নাড়লে টাকা পড়ে’ কথাটার মর্ম কেউ উপলব্ধি করতে পারতো না। বৃটিশদের মন মগজেই শুধু গাছের পাতায় বাতাসের দোলে টাকা আর টাকার সুঘ্রাণ মিশে ছিলো! সে কারণেই তারা-দালালদেও মাধ্যমে ভারত থেকে কর্মট শ্রমিক নিয়ে আসতো এইদেশে। বিস্তর প্রলোভনে এসে শ্রমিকরা জীবন দিয়ে একপ্রকার বৃটিশদের গোলামী করে এই চা বাগানকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যায়!

অভিযোগ নিউজ বিডি ২৪ | OVIJOG NEWS BD 24

বৃটিশযুগে এই বাগানে ১ পয়সা হাজিরায় চা শ্রমিকরা কাজ শুরু করে। এখনও মে মাস বিশ্ব শ্রমিক দিবস এলে এদের হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে ওঠে পুরো লংলা চা গার্ডেনের চা শ্রমিকদের মহল্লাগুলো। ১৭৮ টাকা রোজ হাজিরায় একজন শ্রমিকের সারা শরীরের ঘাম গোছলের একটা ভাল সুগন্ধি সাবান হয় না। পিঠ ও মাথায় ঝুড়ি ভরা নারী চা শ্রমিক বাতাবী, বৈসন্তি, কপিলাদের আক্ষেপের কমতি নেই। ৬ বছর ধরে এই চা বাগানে চৌকিদারীর কাজ করছে নির্মল। কিন্তু এখনও তার ভাগ্য বদল হচ্ছে না! সে নিয়মিত বাগান পাহাড়ায় কাটায়। তার মতো আরও প্রায় ১০ জন পাহাড়াদার আছে এই বাগানে। সবাই শিফটিং উিউটি পালন করছে। বাগান পাহাড়ার সাথে এখন বানর তাড়ানো মতো একটি বাড়তি কাজ যোগ হয়েছে।

নারী পুরুষ প্রতিটি চা শ্রমিকদের থাকার জন্য ৯ টা মহল্লা আছে। সবাই বংশ পরম্পরায় ভিটামাটি আকড়ে আছে! এখানে থাকতে হলে বাবা দাদাদের মতো চা বাগানে কামলা দিতে হবে? আগে দাদা কাজ করেছে, বাবা করেছে, বাবার পর এখন সন্তানকে দায়িত্ব নিতে হবে? ভিটা রক্ষার কিরতেই মূলতঃ শ্রমিকরা অন্য পেশায় না গিয়ে বাধ্য হয়েই বাপ দাদাদের চা শ্রমিক পেশার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না! এভাবেই হাজার হাজার চা শ্রমিকের বসবাস এখনও টিকে আছে বাগানের অভ্যন্তরের প্রতিটি মহল্লায়।

বৃটিশ গতবাধা নিয়মে চা বাগানের মালিক শ্রমিকদের ঐতিহ্যগত ধারার কোন অদল বদল নেই। নেই কোন পরিবর্তন। পুরনো নিয়মেই এখানে সেমিট্রি, বিদ্যালয়, মক্তব মসজিদ, মন্দির, দাতব্য চিকিৎসালয়, বাজার সবকিছুই রয়েছে। হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান সব ধর্মের শ্রমিকরা মিলেমিশে ৯ টি মহল্লায় এক পরিবার হয়েই বসবাস করছে। ওরা কতটা আন্তরিক তার প্রমাণ দিলো- কাচা চা পাতার রেসিপি বাতলে দিয়ে। চৌকিদার নির্মল নিজ হাতে বাগান থেকে চা পাতার কুড়ি তুলে নিয়ে আসলেন। দিলেন মহল্লার ও বাগানের সবচেয়ে প্রবীণজন মধুসূদন লোহারের হাতে। মুরুব্বী নিজ হাতে ফর্মুলা শুধু বাতলেই দিলেন না, কাচা চা পাতা দিয়ে কিভাবে চানাচুর, মুড়ির সাথে খেলে শরীরের বাত ব্যথা উপশম হয় সেই পথ্যও দেখিয়ে দিলেন। মধুসূদন লোহার আরও জানালেন-“আমি এখনও পেনশন পাই ৫০০ টাকা। আর আড়াইশো টাকার পণ্য পাই রেশন হিসেবে। আমি এই বাগানে মালির কাজ করতাম। অবসর হয়েছি বলে বাসায় ঘুমিয়ে থাকি না। এখনও বাগানের ভালোবাসার টানে এসে বাগানেই বসে থাকি। প্রকৃতিকে তো আর ভুলে থাকা যায় না? আর আসল কথা হলো-এই বাগানে ২ প্রকারের বানর আছে। বড় ধরনের বানর-যার নাম হনুমান বানর। ওর লেজের অংশ লাল। আর একটা বানর হলো একটু ছোট। দেশীয় প্রজাতির বানর ওরা। ওদের কাছে ছুটে আসি। ওরা এই চা বাগানের সৌন্দর্য বর্ধন করছে এখন। ১০-১৫ বছর আগেও তো আমি এই ডানকানের মালি ছিলাম। তখন আমি কোন বানরই দেখি নাই। এখন আপনার চোখ যেদিকে যাবে, দেখবেন ওরা সবখানে নির্ভয়ে কিভাবে প্রকৃতির সাথে মিশে আছে। ওরা হাাঁটাচলা করছে। বাচ্চা কোলে ঘুরছে। এই গাছে সেই গাছে খেলাধুলা করছে। আপনাদের মতো পর্যটক আসলে বাচ্চা সামলে আড়ালে চলে যাচ্ছে ভয়ে। আমাদের ওরা বন্ধুর মতো ভালোবাসে। বুঝে ওরাও আমাদেরই মতো এই একই বাগানের অধিবাসী। এরা মানুষের মতোই আচরণে অভ্যস্থ বলে মানুষের পরিবেশে থাকতেই ভালোবাসে। কিন্তু যে হারে এদের বাচ্চা হচ্ছে আর বংশ বাড়ছে এটা নিয়েই আমরা চিন্তিত আছি। আমাদের ৯ মহল্লার কেউ গাছের একটা আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা ফল লাগিয়ে খেতে পারছি না।”

তবে ভ্রমণকারীরা অভিযোগ করেছেন, ডানকান কৃর্তপক্ষ বানরদের জন্য আলাদা কোন খাবার দিচ্ছে না। বরং তাদের লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে বানরদের নিষ্ঠুরভাবে লাঠিপেটা করে দেখলেই তাড়িয়ে দেয়। বানর চা গাছ ভেঙে ফেলে বলে অভিযোগ করছেন-বাগানের পাহাড়াদার-কর্মচারীরা। ভ্রমণকারীদের কাছে বানরের দল মনোরঞ্জণের বিষয় হলেও-ডানকান চা বাগান কর্তৃপক্ষের কাছে বানর এখন এক জটিল উপদ্রব্যের নাম!

ঢাকা থেকে বাগান পরিদর্শনে আসা প্রকৃতি প্রেমী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করা সংস্থা বৃক্ষালয়’র প্রতিষ্ঠাতা মারুফ আহমেদ জানালেন-এই চা বাগানে আমরা ২ প্রজাতির বানরের সন্ধান পেয়েছি ঠিক আছে কিন্তু তাদের পর্যাপ্ত খাবারের অভাব লক্ষ্য করছি। প্রতিটি বানরই অভয়ারণ্য ছেড়ে লোকালয়ে নেমে এসেছে খুধার তাড়নায়। ওদের আচরণ বিচরণ দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছে। সরকারি ভাবে ওদের খাবারের সংস্থান করাটা জরুরি। স্থানীয় পরিবেশপ্রেমীদের আহবান করবো আপনারা বানরদের জন্য কলা, বাদাম, তরমুজ ও বিভিন্ন ফল ফলাদীর ব্যবস্থা করুন। ওরা নিয়মিত খাবার পেলে ভুলেও লোকায়য়ে মানুষের বাড়ির গাছ গাছালিতে হানা দিবে না। আর যারা লংলার এই চা বাগান ভ্রমণে আসবেন-অনুরোধ খালি হাতে আসবেন না কেউ। চারপাশে বানরের বিচরণ। ওদের অহেতুক ভয় না দেখিয়ে ওদেও প্রতি খাবার তুলে দেন। দেখবেন ওরা আপনার আরও কাছে এসে আপনার হাত থেকে খাবার নিয়ে যাবে। ওরা ভয়ঙ্কর ও হিংস্র নয়। ওরা অসহায় প্রাণী। একটি পুর্ণবয়স্ক বানর ২ বছরে একবার বাচ্চা প্রসব করে। একটি বাচ্চা বড় হতে না হতেই ওরা সন্তান ধারণ করে না। বরং সন্তানটিকে ফল পাতা খাওয়ার উপযোগী (প্রায় ৬ মাস বয়সী) না করা পর্যন্ত মা বানর নিজের সাথে সাথেই রাখে সবসময়। সুতরাং বানরের বংশ বেড়ে যায়, এটা প্রকৃতির হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। তবে আমরা অনেকেই জানি না। বানর গোত্রীয় ও দল নিয়ে বসবাস করা প্রাণী। পুরো বানর বাহিনী এই বাগানের একখানে জমায়েত হবে না। ৯ টি মহল্লায় ওরা আলাদা আলাদা বসবাস করবে। বিচরণের স্থানও ওদের আলাদা হয়ে থাকে। সুতরাং ওদের নিয়ে ভয় পেয়ে আমাদের নিষ্ঠুর হওয়া উচিত হবে না। ওরা ওদের মতো জীবনযাপন করুক।

অভিযোগ নিউজ বিডি ২৪ | OVIJOG NEWS BD 24

চা বাগানের বাণিজ্যিক কাজে প্রকৃতির বন্ধু ২ প্রজাতির এই সুন্দর সুন্দর বানর কেন মানুষের শত্রুতে পরিণত হবে? ওরা একটু খাবারের সন্ধানেই নেমে আসে চা বাগানের এই নয়নাভিরাম দৃশ্যলোকে!

পরিবেশ প্রেমীরা এগিয়ে আসলে হয়তো লাঠির বাড়ি খেয়ে ওদের মরতে হবে না।

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এই বাগানের বনাঞ্চলে ওদের খাবার উপযোগী বৃক্ষরোপন জরুরি। গাছগুলো বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত বানর বাহিনীর জন্য নিয়মিত খাবারের সু ব্যবস্থা-র জন্য ভ্রমণ পিপাসুরা চাইছেন সবাই একযোগে এবার এগিয়ে আসবেন।

Facebook
Twitter
LinkedIn