মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় এলাকাতে গ্যাস সংকেট চলছে। বিগত সরকারের সময় থেকে নিয়ে এখনও একই সংকটে ভুগছে ঢাকাবাসী। দেশের মোট গ্যাসের ১২ শতাংশ ব্যবহার হয় আবাসিক খাতে। বাকি গ্যাস শিল্প, সার, বিদুৎসহ অন্যান্য শিল্পে। শিল্প ও আবাসিক মিলিয়ে তিতাসের মাসিক আয় কিন্তু থেমে নেই। এদিকে-
শহরের মানুষ শতভাগ গ্যাস বিল পরিশোধ করা সত্ত্বেও কেন ষোলআনা লাইনের গ্যাস পাচ্ছেন না,তিতাস বিষয়টি নিয়ে সদুত্তর দিচ্ছে না। অবৈধ উপায়ে গ্যাসের ব্যবহারে তিতাসের লোকজনের সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলছে। তবে কর্তারা বলছেন,অবৈধ উপায়ে গ্যাস সরবরাহ করলে তো কোম্পানীগুলোই বড় রকমের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে।
অনেকে বলছেন,একদিকে রাজস্ব আয় থেকে ঠিকই বঞ্চিত হচ্ছে, তার চারগুণ তুলে নিচ্ছে- তিতাস আবাসনের গ্রাহকদের থেকে মিটার, বিল ও গ্যাস বিল থেকে। গ্রাহকরা আরও চাপে আছেন, এবং তিতাসের বিরুদ্ধে সম্পুন অন্যায়ভাবে গ্রাহক থেকে গ্যাস বিলের নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ তুলেছে। সবার একটাই কথা-
মাসের পর মাস গ্যাস থাকে না, তবু বিল মাফ নেই।পাই পাই করে বিল বুঝে নিচ্ছে তিতাস …
লাইনের গ্যাসের প্রকৃত গ্রাহকের চেয়ে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারী গত বছরের চেয়ে এবছর আরও বেড়েছে। সে কারণে আবাসনে গ্যাস সংকট বতমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে। এখনও রাজধানীর আশে পাশে প্রতিটি মহল্লায় ১০ টা বৈধ লাইনের সাথে ১ টা অবৈধ খুঁজে পাওয়া যাবে। এমনকি তিতাসের নাকের ডগায় সিংগেল আর ডাবল বার্নারের এসব সংযোগ কোথা থেকে আসছে, শহরের ভিতরের এলাকাগুলোতে বেশিরভাগ টীনসেডের বাড়িওয়ালারা আর তিতাসের কর্মীরাই বলতে পারবেন। যদিও তিতাস বলছে,ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ১৮ হাজারের বেশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে।
তিতাসের দাপট আর অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের মাসুল দিচ্ছে সম্পুর্ণ্ বৈধ গ্রাহকেরা। কি কারণে লাইনে গ্যাস নেই। গৃহিনীদের সারাদিন বসে থাকতে হয়,ঘন্টার পর ঘন্টা, কখন গ্যাস আসবে-কখন চুলোয় আগুন জ্বলবে। এই এক অসহনীয় যন্ত্রণায় কাটছে রাজধানীর নগরজীবনের প্রায় কমবেশি পরিবারের। চুলোয় গ্যাসে নেই। এই বিড়ম্বনা কোন কোন এলাকায় দীঘ ১০ বছরের। আবার কারও লাইনে গ্যাস আসে না ২-৩ বছর থেকে। তবে নতুন যেসব এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট, এসব এলাকার মানুষের অভিযোগও গ্যাস সংকটের মতই তীব্র!
নাগরিক মহলের একটাই কথা, আমরা গ্যাসের চুলো জ্বালাই,জ্বলে না। কারও আবার এক শলতে পরিমাণ ইকটু আদটু জ্বলে। ঠিক মতো লাইনে গ্যাস না আসায়,বাসা বাড়িতে ঠিক মতো গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না।
চুলোয় আগুন জ্বলুক বা না জ্বলুক,তিতাস বলছে চুলোয় যাক! গ্রাহক সেবা পাচ্ছে না। এমনও পরিবার আছেন,পুরো মাসটিই সিলিন্ডার কিনে সমস্যা মোকাবিলা করছে, কিন্তু বাড়িওয়ালারা একটি টাকার ছাড় দিচ্ছেন না। বাড়িওয়ালা বলছেন, তিতাস কি আমাদের ছাড় দেয়? লাইনে গ্যাস আসে না। চুলোয় আগুন জ্বলে না। আমাদের থেকে তো তিতাস পাই পাই করে পুরো মাসের বিল নিচ্ছে!ভাড়াটে কিংবা বাড়িওয়ালা কারও কোন কথাই আমলে নিতে নারাজ-১৯৬৪ সালের গবিত প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোং লিঃ।
অনেক গ্রাহক রাগে ক্ষোভে চুলোয় আর দেশলাই জ্বালাচ্ছেন না। বিকল্প ব্যবহার করছেন- সিলিণ্ডার গ্যাস,ইলেকট্রিক ডিভাইসের-ইনডাকশন,ইনফারেট চুলো। মাসে গ্যাস বিলও দিতে হয়,১২ কেজির একটা এলপিজির জন্য প্রায় ১৫০০ টাকাও গচ্চা দিতে হচ্ছে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারকে। আয়ের চেয়ে খরচের লিষ্ট এই গ্যাস সংকট মধ্যবিত্তের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। তিতাসের বিরুদ্ধে প্রতিটি বাসা বাড়ির গৃহিনীরা যেভাবে হাঁক ডাক দিচ্ছেন,যে কোন দিন দেখা যাবে, নারীরাও যেন হাতে ডাল ঘুটনি খুন্তা নিয়ে আন্দোলন পাড়ায় নেমে পড়েছে!
সমস্যা সমাধানে আশানুরূপ কোন বার্তা তিতাস থেকে তো আসছেই না,উল্টো কয়দিন পর পর তিতাস এমন এক সংবাদ প্রচার করে,গ্যাস বিড়ন্বনায় থাকা ভুক্তভোগীরা আরও ক্ষেপে উঠছেন। যেমনটা তিতাত আজকেই প্রচার করেছে :
“১১ ঘন্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়!”
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত তিতাসের এই নোটিশেকে ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ মনে করছেন রাজধানীবাসী।নেটিজেনরা এসব নোটিশে হাস্যক্যেতুকেও মেতে ওঠেন অনেকে।ভুক্তেভোগী কেউ বলেন,‘গ্যাস থাকবে না,এটা না বলে,ওদের বলা দরকার: গ্যাসটা থাকবে কখন? কেউ আবার বলেন:‘গ্যাস তো অতিথি পাখির মতো।কারও বাসায় তো সারাদিনও থাকে না।এই মানুষ নোটিশ শুনে কি করবে?’ কেউ কেউ দাবি করেন- ২৪ ঘন্টার ভেতর নাকি ২০ ঘন্টাই গ্যাস থাকে না।তো বাকী ৪ ঘন্টায় নারীরা কি রান্না করবে না চুলোর আগুন নিয়ে যুদ্ধ করবে!’
ক্ষোভে ফেটে আছেন অনেক বাড়িওয়ালা:‘গ্যাস নিয়মিত না পাওয়ায় প্রতি মাসেই ভাড়াটে চলে যাচ্ছে!পয়সা দিয়ে থাকবে মানুষ,গ্যাস না পেলে কেন ভাড়া থাকবে?’
সমস্যা একদিন দুইদিন হলে খাবার রেস্তোরা থেকে কিনে খাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বছরের পর বছরকি এভাবে সম্ভব? বাসা বাড়িতে ৩ বেলার খাবার তৈরির যে তাড়না,গ্যাস সংকটে নাগরিক জীবনে আরও চিন্তার ভাজ ফেলছে।কয়েকটি বাসা বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়,১২টার পর অনেক বাড়িতে ভালই আগুন পাওয়া যায়।ভোরের দিকেও অনেক বাসায় গ্যাস থাকে।কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে চুলোর আগুনও যেন কমতে থাকে।৭ টার পর চুলোর আগুনের প্রজ্জ্বলতা থাকে না। ঢিমে হয়ে যায়। কোন এলাকায় গ্যাস আসে-কারও বা ৩ টার পর। কারও আসে বিকেল ৫ টায়।এভাবেই চলছে মা বোনদের রন্ধনশালার চরম গ্যাস সংকটের হেসেল বন্দনা!
রাজধানীর গ্যাস সংকটে জজড়িত এলাকার মধ্যে আছে-মাদারটেক, বাসাবো,খিলগাঁও,তিলপাপাড়া,গোড়ান,মেরাদিয়া,বনশ্রী,রামপুরা,নন্দীপাড়া,দক্ষিগাঁও,
কদমতলা,সবুজবাগ,আহমদবাগ,মুগদাপাড়া,মান্ডা,
মানিকনগর,শনিরআখড়া,রায়েরবাগ,যাত্রাবাড়ী,ডেমরা,জুরাইন,
সাইনবোড,গেন্ডারিয়া,মাতুয়াইল,কোনাপাড়া,কামরাঙ্গীরচর,হাজারীবাগ,
লালবাগ,পুরানঢাকা,মগবাজার,কুড়িল,বাড্ডা,বসুন্ধরা,মহাখালী,
সাতারকুল,কালাচাঁদপুর,ভাটারা,নতুনবাজার,জোয়ারসাহারা,
উত্তরা,উত্তরখান,দক্ষিণখান,টংগী,তুরাগ,মিরপুর,তেজগাঁও,
নাখালপাড়া,টিক্কাপাড়া,কাটাবন,ফামগেট,ইন্দিরারোড,
এলিফেন্টরোড,ধানমন্ডি,মোহাম্মদপুর,রায়েরবাজার,আবদুল্লাপুর,
সাভার,বাইপাল,আশুলিয়াসহ আরও বেশ কিছু এলাকা।
মাসের পর মাস গ্যাস থাকে না তবু বিল মাফ নেই। সবাইকে তিতাসের গ্যাস বিল ঠিকই দিতে হয়।এই অভিযোগের দায়ভার থেকে তিতাসের মুক্তির উপায় মানেই-অনতিবিলম্বে এই সংকট নিয়ে কাজ করা।ভোক্তারা কেন অভিযোগ করছে-সংযোগ আছে, লাইনে গ্যাস নেই। তবু গ্যাস লাইন চাজ, মিটার ভাড়া তো প্রত্যেক গ্রাহকই পরিশোধ করছেন।অনেকে আবার আবাসিক এলাকা থেকে কল-কারখানা সরানোর জন্য লিখিত অভিযোগও করেছেন।কিন্তু পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকেও নেয়া হচ্ছে না কোন উদ্যোগ।আবাসিকে কল-কারখানা শুরু করে অনেকে গোপনে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া সেসব এলাকার লাইনের গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় পরিবেশ ও প্রকৃতি দুষণ ঘটাচ্ছে।
