মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি
সম্প্রতি বহু গ্রাহকের মোবাইল সিম হঠাৎ ডিয়েকটিভ হওয়ার খবর শোনা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু সিম ভোক্তারা এই অসুবিধা ফেস করছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ উঠে এসেছে। সবার ক্ষোভ একটাই-কোন প্রকার আগাম বার্তা, নোটিশ ছাড়া চালু সিমটি হঠাৎ করে কেন অকেজো হয়ে পড়বে।
মোবাইল অপারেটর কোম্পানীগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর সিম নেটওয়ার্ক দেখানো বন্ধ করে দিচ্ছে। অথচ একই ডিভাইসে গ্রাহকের অন্য সিম ঠিকই সচল থাকছে!
সমস্যা সমাধানে কাষ্টমার কেয়ারে গেলে বলছে-“নতুন সিম তুলতে হবে। খরচ পড়বে মাত্র ৪০০ টাকা!”
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে চোখে পড়ল প্রতিটি মোবাইল সিম বিক্রয়ের সময় সিমের প্যাকেটের গায়ে একটি ছোট্ট বাক্যে লেখা-“ প্রতিটি সিম কার্ড বিক্রয় থেকে ট্যাক্স বাবদ … টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।” অথচ বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নতুন সিম বিক্রয়ের পাশাপাশি সিম রিপ্লেসমেন্টের নামে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো যে বিশাল অঙ্কের টাকা আদায় করছে, তা কতটা গ্রহণযোগ্য ও সরকার এর কতটুক সুবিধা ভোগ করছে? আদ্যে কোম্পানি থেকে প্রদত্ত অর্থ সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে কিনা? না কোম্পানীর পকেটেই থেকে যাচ্ছে সিম থেকে আয়ের সিংহভাগ?
নতুন সিম তুললেই গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে ৪০০ টাকা। যে কোন সিম ডিয়েকটিভ হওয়া মানেই কাস্টমার কেয়ারে হাতে আগে ৪০০ টাকা নিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে গ্রাহককে। এই বিষয়টা নিয়ে সিম গ্রাহকরা এখন শুধু অভিযোগই তুলছেন না। সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামণা করছেন।
শুধুমাত্র পুরনো সিম গ্রাহক না, যারা মাত্র কয়েক মাসে নতুন সিম কিনেছেন, তারাও কিন্তু একই বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। অথচ গ্রাহকেন কোনো ভুলে এই কাণ্ডটা ঘটছে বলে প্রমাণ মিলছে না!
আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সিম রিপ্লেসমেন্ট যুক্তিযুক্ত। সিম হারিয়ে গেলে,ফোন চুরি হলে, গ্রাহকের মৃত্যু হলে, সেবা আবগ্রেড বা সিম ৩জি-৫জি করলে সিম রিপ্লেসমেন্ট বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিনা নোটিশে মোবাইল সিম কোম্পানীরা উপযুক্ত ব্যাখ্যা ছাড়া যেভাবে সিম বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে হয়রানিতে ফেলছে, এটা নিয়ে সবার ক্ষোভ বিভিন্ন কাস্টমার কেয়ারে গেলে চোখে পড়ছে।
কোম্পানিরা খেয়ালখুশিতে সিম বন্ধ করে পুনরায় ৪০০ টাকায় সেই একই সিম নতুনভাবে ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া কতটা বৈধ?
দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে প্রতিদিন যদি ১০ হাজার সিম “রিপ্লেস” হয় তাহলে রোজ গ্রাহকের পকেট থেকে যাচ্ছে ৪ কোটি টাকা! বছরে দাঁড়ায় প্রায় ১,৪৬০ কোটি! এতে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রাহক, সরকারকে পাশ কাটিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে মোবাইল সিম কোম্পানি সব। অথচ সরকারকে সিম বিক্রির ওপর উৎস কর, মোবাইল কোম্পানীর লাভের ওপর কর্পোরেট ট্যাক্স, ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জ নিয়মিত পাওয়ার কথা। তবে সিম রিপ্লেসমেন্টের টাকাগুলো “ সেবা বাবদ” আদায় করা হচ্ছে বলে অনেক সময় সেগুলো হয়তো হিসেবেই আসছে না সরকারি রাজস্ব বিভাগে!
অনেক কাষ্টমার কেয়ার এজেন্ট দাবি করছেন, “ আমরা ১০০ টাকা আয় করলে সরকারকে দিচ্ছি ৪৫ টাকা।” কিন্তু সেটা কি সত্যি যাচাইযোগ্য? নাকি কোম্পানির পক্ষ থেকে দায় কোন দায়সাড়া বাক্য?
ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেন, একবার রিপ্লেস করা সিম ২ মাস পর আবার নেটওয়ার্ক না দেখালে নতুন করে কেন আমাদের পুনরায় ৪০০ টাকা দেয়া লাগছে? অথচ এই লেনদেনের নেই কোন ডাটা ট্রাকিং কিংবা ফেয়ার ট্রান্সপারেন্সি! অথচ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুসারে যদি কোনো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের সাথে প্রতারণা করে, তবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানের উল্লেখ আছে। তাহলে কোম্পানির মোবাইল সিম বিষয়ক প্রতারণার বিষয়টি কেন সেই একই আইনের আওতায় সরকার আনছেন না? অভিযোগকারীরা মনে করছেন-“ সিম ইনেকটিভ করে রিপ্লেসমেন্টের নামে টাকা আদায় করে মোবাইল সিম কোম্পানি, যা- মোবাইল সেবা না, শোষণের যন্ত্রে রূপান্তরিত করছে।” রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মোবাইল কোম্পানিগুলোর এই গোপন রাজস্ব প্রবাহে নজরদারি না থাকলে, দেশের সাধারণ মানুষ শুধু প্রযুক্তির সুবিধা নয়, তার অপব্যবহারও বয়ে বেড়াবে দীর্ঘদিন।
কোম্পানিগুলোর গ্রাহকের সেবায় মন দিতে হবে। ব্যবসা তো দিচ্ছেনই দেশের সিম ব্যবহারকারীরাই। কোম্পানিদের বিষয়টি ভুললে চলবে না-একটি সিম একবার বিক্রি হওয়ার পর সেই গ্রাহক বছরের পর বছর সেই কোম্পানির ব্রান্ড এম্বাসেডর হিসেবে কাজ করে চলেছেন। অথচ তিনি পাচ্ছেন না কোন সম্মান। পাচ্ছেন না কোম্পানির তরফ থেকে কোন উপহার।
এই গ্রাহকই প্রতিদিন সেবার নামে বারবার আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন!
যা সত্যি অমানবিক।
ছবি: অনলাইন
