মারুফ আহমেদ
সৈয়দ আব্দুস সাত্তার ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা। মাদ্রাসা শিক্ষা প্রসারে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় মূলতঃ ২০১৬ সালে। অবাক করার মতো ঘটনা- শিশু শ্রেণীতে মাত্র ১ জন ছাত্র নিয়ে এই মাদ্রাসায় লেখাপড়ার হাতেখড়ি শুরু হয়। একটি ক্লাসরুমে মাত্র ১ জন শিশু শিক্ষার্থী নিয়ে এগিয়ে চলা মাদ্রাসাটি আজ মনরাজ, কুলাউড়া উপজেলা, মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম একটি দাখিল মাদ্রাসা হিসেবে সু প্রতিষ্ঠিত।

শিশু শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী বা দাখিল মাদ্রাসাটির শিক্ষক শিক্ষিকারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ধরে রাখার জন্য। ছাত্র ছাত্রীদের খুব দক্ষতা ও যত্নের সাথে শিক্ষাদানে সচেষ্ট আছেন প্রতিষ্ঠানের ১১ জন শিক্ষক শিক্ষিকা। ছাত্র ছাত্রী আছে ১৪০ জন। ২০ জন দাখিল পরীক্ষার্থী।
মাদ্রাসা সুপার ১ জন। পুরুষ শিক্ষক ৬জন। শিক্ষিকা আছেন ৫ জন। মাদ্রাসা সুপারের দায়িত্বে আছেন- জনাব, মোহাম্মদ আলী। এছাড়াও অন্যান্য সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকারা হলেন – রুবিনা আক্তার, মিনারা আক্তার, আজিমা আক্তার, ওয়াহিদা জান্নাত ওহি, তামান্না আক্তার, জামাল উদ্দিন, তানভীর আহমেদ, মুহতাসিম সাকিব, সৈয়দ শাহরিয়ার ইসলাম, জুবায়ের আহমেদ প্রমুখ।
সৈয়দ আব্দুস সাত্তার ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা এতদিন একটি কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ছিল। তবে ২০২৬ সাল থেকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নব গঠিত একটি ট্রাস্ট বোর্ড দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা আছে। রাজনীতিমুক্ত একটি সুন্দর পরিবেশে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিতে এই ট্রাস্টি বোর্ড একতাবদ্ধ।
এলাকার অত্যন্ত সুহৃদ মানুষ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জনাব সৈয়দ ইকবাল সালাম ৪৯ শতক জমি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দান করে এলাকায় অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। আবুধাবী দুবাই এই পৃষ্টপোষক, পাল গ্রামের মাহবুব আলম চৌধুরী কামরান মাদ্রাসা ছাত্র ছাত্রীদের প্রতিষ্ঠানের পোষাক উপহার দিয়েছেন।

ছাত্র ছাত্রীদের লেখাপড়ার মানোন্নয়নে অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক সভার আয়োজন করা হয়। এবং সবার মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়। আশে পাশে ২ টা আলিয়া মাদ্রাসা ও ৪ টা হাফিজিয়া মাদ্রাসা আছে। বৃষ্টিতে দুরে গিয়ে লেখাপড়া কষ্ট হলে এলাকার আশে পাশের ছাত্রছাত্রীরা এখানেই ভর্তি হয়। বর্তমানে ১৫-২০ জন স্থানীয় দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা পরিবার থেকে সহযোগিতা নিয়ে সৈয়দ আব্দুস সাত্তার ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা এগিয়ে চলেছে।
এলাকার আরও অনেকেই মাদ্রাসা শিক্ষায় ছেলেমেয়েদের পাশে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। সবার আর্থিক অনুদান, সহযোগিতা ও সু-পরামর্শে প্রতিষ্ঠানটি আরও এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন মাদ্রাসা সুপার মোহাম্মদ আলী চৌধুরী।
তিনি আরও বলেন, “এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গতানুগতিক ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। আধুনিক ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে পরিচালিত। আরবী ইংরেজী শিক্ষার সাথে আইসিটি শিক্ষায় ছাত্র ছাত্রীরা দক্ষ হয়ে সমাজের সকল শাখায় ওরা একদিন নের্তৃত্ব দিতে পারবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ভবিষ্যতে কুলাউড়া উপজেলার একটি আধুনিক মডেল মাদ্রাসা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সকালে শিশুদের মক্তবের আরবী শিক্ষার পাশাপাশি এখানে নৈতিক শিক্ষা চালু করা হয়েছে। ভবিষ্যতে হিফজ শাখাও চালু করা হবে। নবম-দশম বিজ্ঞান শাখা খোলারও পরিকল্পনা করা হয়েছে।”
সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে- প্রতিষ্ঠানটির মডেল একাডেমীর একটি ভবিষৎ ভবন নির্মানের ওপর একটি সাইনবোর্ড। পাশেই রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান টিনসেড ভবন। কোন রকমে শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস নিচ্ছেন। একটি রুম থেকে আরেকটি রুমের মাঝে কোন পার্টিশন নেই। ক্লাসরুম গুলোর খুব করুণ অবস্থা। এমন কক্ষ আছে ৬ টি। আর ৩ টি কক্ষের কাজ এখনও অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ৯ রুমের এই টীনসেড ভবনের কাজ চলমান অবস্থায় তবু বাচ্চাদের শিক্ষার আলো থেমে নেই। ২০১৩ সাল থেকে সবার আর্থিক অনুপ্রেরণায় কোনমতে চলছে আপাততঃ টীনসেড ঘরের নির্মাণ ও সংস্কার কাজ। এখনও ৯ টা কক্ষের ২৭ টা দরোজা, ৯ টা জানালা প্রয়োজন। দরোজা জানালা ছাড়াই চলছে এখানে লেখাপড়া!
যা খুবই হৃদয়বিদারকই মনে হলো!
নেই মাদ্রাসায় প্রবেশদ্বার বা মেইন গেট। নেই চারদিকের বাউন্ডারী দেয়াল। শিক্ষকদের বসার ঘর, সুপারের ঘরটিরও ভগ্নদশা! নেই কোন লাইব্রেরী। নেই কোন সেমিনার কক্ষ। আসবাবপত্রও খুবই অপ্রতুল। শিক্ষকরা সবাই একসাথে বসতে পারে না। বাড়তি ক’জন অভিভাবক আসলেও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেক শিক্ষক শিক্ষিকাকে। চেয়ার টেবিল লেখাপড়ার বেঞ্চের খুব বেশি সংকট দেখা যাচ্ছে। ওজুখানা নেই। বাথরুমের অবস্থা আরও ভয়াবহ! টাংকি, বাথরুম ও ওজুখানা খুব দ্রুত আশু সমাধান প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন শিক্ষক শিক্ষিকারা। এলাকার গণমান্য দানশীল ব্যক্তিদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পাশে এগিয়ে আসাটা খুব জরুরি।
লংলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর অধীনে এখানে “লংলা ইসলামিক ইনস্টিটিউট” নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা। যা সুদুরপ্রসারী। কিন্তু বর্তমানে আধা ভাঙ্গা যে শিক্ষালয়টিতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে, এরাই একদিন দাখিল পরীক্ষার্থী হয়ে কুলাউড়া উপজেলায় লংলা, মনরাজ এলাকার সম্মান কুড়িয়ে আনবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের একটি ভাঙ্গা ক্লাসরুমে ক্লাস করে এই অসাধ্য সাধন করা খুব কঠিন হবে, যদি না ৯ টা ক্লাসরুমের অতি দ্রুত সংস্কার কাজ সম্পুন্ন করা না হয়।