মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি
বিকাল ৪টায় ইউনেস্কো এ্যাক্রিডিয়েটেড সংস্থা ভাবনগর ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে ফ্রান্সের বহুভাষী গবেষক, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কবি আলাওলের সাহিত্য-বিশেষজ্ঞ এবং The Shade of the Golden Palace: Alaol and Middle Bengali Poetics in Arakan ও Meaningful Rituals: Persian, Arabic, and Bengali in the Nürnama Tradition of Eastern Bengal শীর্ষক গ্রন্থ প্রণেতা ড. থিবো দুবের (Dr. Thibaut d’Hubert)-কে “বিদ্যাবিনোদ” উপাধিতে ভূষিত করেছে। তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপাধি প্রদানের সদনপত্র ও ক্রেস্ট প্রদান করেন ভাবনগর ফাউন্ডেশনের সভাপতি বাংলাদেশের খ্যাতিমান গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়া ও ভাবনগর ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক কথাসাহিত্যিক নূরুননবী শান্ত।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বহুভাষী ফরাসি পণ্ডিত এবং মহাকবি আলাওলের কাব্য-বিশেষজ্ঞ ড. থিবো দুবেরর সংবর্ধনা ও উপাধি প্রদান অনুষ্ঠানের স্বাগত ভাষণে নাট্যকার ও গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়া বলেন, “বর্তমান বিশ্বে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের মধ্যে ড. থিবো দুবের বিদ্যাবিনোদ শীর্ষস্থানীয়। তিনি কৃত্তিবাসী রামায়ণ দিয়ে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য গবেষণা শুরু করেন, পরবর্তীকালে আলাওলের কাব্য নিয়ে তিনি দুই পর্বে একাডেমিক গবেষণা সম্পন্ন করেন। প্রথমে তিনি এমফিল গবেষণা সম্পন্ন করেন ইন্দো-পার্সিয়ান কালচার এবং মধ্যযুগের বাংলায় আলাওলের সাহিত্যকর্মের বিশ্লেষণের মাধ্যমে, পরে তিনি পিএইচডি গবেষণা করেন কাব্যিক অনুবাদ ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে আলাওল ও সপ্তদশ শতকে আরাকান রাজসভার বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য বিষয়ে। কিন্তু এখানেই তিনি থেমে থাকেননি প্রায় পনোরো বছর ধরে আমার সঙ্গে আলাওলের সয়ফুলমলুক-বদিউজ্জামাল সম্পাদনার পাশাপাশি অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া, মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের ধারায় রচিত মোহাম্মদ শফির নূরনামা নিয়ে বিশ্লেষণী গবেষণা সম্পাদন করেছেন। তাঁর ধ্যান-জ্ঞানের মধ্যে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তিনি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য-বিদ্যাকে আনন্দের এতো গভীর আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন যে তাঁকে আমরা বিদ্যাবিনোদ উপাধি দিতে বাধ্য হয়েছি। এই বিশেষণ তিনি তাঁর কর্মগুণেই অর্জন করেছেন।”
অনুষ্ঠানে ড. থিবো দুবের বিদ্যাবিনোদ-এর পরিচিতি ও উপাধি ঘোষণা করেন খ্যাতিমান কবি শাহেদ কায়েস। এরপর যথাক্রমে ভাবনগর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে চর্যাপদ পুনর্জাগরণের শিল্পী সাধিকা সৃজনী তানিয়া এবং ভাবনগর সাধুসঙ্গের পক্ষ থেকে শিল্পী শিলা মল্লিক ফুলের মালা পরিয়ে ড. থিবো দুবের বিদ্যাবিনোদ-কে সংবর্ধনা প্রদান করেন।
পরে ড. থিবো দুবের বিদ্যাবিনোদ-এর উপাধি প্রদানের সার্টিফিকেট ও স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেন ড. সাইমন জাকারিয়া ও নূরুননবী শান্ত।
সংবর্ধনা ও উপাধি গ্রহণের পর ড. থিবো দুবের বিদ্যাবিনোদ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “এই উপাধি আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি বলে মনে করছি। এই উপাধি গ্রহণের মাধ্যমে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য গবেষণার জন্য আমার দায়িত্ব আরও বাড়লো। আপনারা জানেন, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য আমার প্রিয় বিষয়। আমি আমার জীবনের সিংহভাগ সময় মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য গবেষণায় ব্যয় করেছি এবং এখনও করে যাচ্ছি। এখন উপলব্ধি করছি আমাকে সারাজীবন এই কাজ করে যেতে হবে।”
ড. থিবো দুবের বিদ্যাবিনোদ-এর সংবর্ধনা ও উপাধি প্রদানের পূর্বে তাঁর সম্মানে ভাবনগর সাধুসঙ্গের শিল্পীদের পক্ষে প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধগান চর্যাপদ পরিবেশন করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের সুরকার, শিল্পী ও প্রশিক্ষক সাধিকা সৃজনী তানিয়া, বরিশালের সাধক শিল্পী শাহ আলম দেওয়ান, শরিয়তপুরের শিলা মল্লিক, মানিকগঞ্জের বাউল অন্তর সরকার, পটুয়াখালীর বাউল আনিস মুন্সী, জামালপুরের হেলাল উদ্দিন, ঝিনাইদহের ফতেহ কালাম, কিশোরগঞ্জের অন্ধ আল-আমিন সরকার পিপাসী, জিল্লুর সরকার, জাকির চিশতি, হাসান মিয়া প্রমুখ।
সবশেষে জ্ঞাপন করেন ভাবনগর ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নূরুননবী শান্ত। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি সাইফ হাফিজ।
উপস্থিত সুধীজনদের মধ্যে ছিলেন কবি ব্রাত্য রাইসু, সাংবাদিক তরুণ সরকার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক মঞ্জুলা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. শহিদুল হাসান, সংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইম রানা, বাংলা বিভাগের প্রভাষক জোবায়ের আব্দুল্লাহ্, মোঃ নাজমুল হোসেন, লেখক অর্জয়িতা রিয়া, চলচ্চিত্রকার ইভান মুনোয়ার, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহানুজ্জামান সোহান, গবেষক ড. আবু সাঈদ তুলু, চিত্রশিল্পী নাছির আহম্মেদ, পুথিকার আবুল বাশার তালুকদার, অনুবাদক অনন্ত উজ্জ্বল প্রমুখ।
