মারুফ আহমেদ

ঢাকা সহ আশে পাশে তীব্র গরমের পর শীতল-মেঘের দেখা মিললেও ঢাকা বাইরে আকস্মিক ঝড়ো হাওয়ার সাথে যেন নেমে আসেন মৃত্যুদূত!
বৈশাখী উৎসব পেরুতেই দেশে শুরু হয় কালবৈশাখী তান্ডব। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের সাথে এখন একটি ভয়াবহ হুমকী হলো ‘বজ্রপাত’। প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে শত শত মানুষ অকাতরে জীবন দিচ্ছে। খবরের শিরোনামেই শুধু বজ্রপাতকে দেশবাসী শুধু জানতে পারছে ‘বজ্রপাত’ গ্রামীন জীবনে শোকের মাতম জারী করা একটি আতঙ্কের নাম। দেশে বছরের শুরুতে এভাবেই একের পর এক ঝরবৃষ্টি বজ্রপাত হয়, এটাই যেন নিয়তি। এটাই সবাই একটি নিয়মিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে মেনে নিচ্ছে। অথচ বজ্রপাত নিয়ে সরকারি বেসরকারিভাবে জোড়ালো কোন ভূমিকা নেই। আগাম প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা বিষয়ক কর্মসূচী নেই। গ্রামের মানুষ বজ্রপাত নিয়ে বরাবরই অবহেলার শিকার। এমনকি নিহত ব্যক্তির পরিবার সমবেদনা ছাড়া কোন সহায়তা পান না। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিরা পায় না উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা। বজ্রঝড়ের জলন্তপিন্ডের জ্বলা সহে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হচ্ছে!
সরকারিভাবে শুধু প্রকৃতিকে দোষারোপ করেই খালাস! দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, আবহাওয়া অধিদপ্তর বজ্রপাতে মানুষ মারা গেলেই শুধু নিজেদের ভাষ্য প্রকাশ করে থাকে। বজ্রপাত হওয়ার সময়টুকুতে নিরাপদে থাকার কথা কেউ উচ্চারণ করছেন না। এক্ষেত্রে আগাম কোন সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও দেখেনি কেউ কখনও। এদিকে বজ্রপাত কতটা রূঢ় আচরণ করছে আমাদের সাথে, চলতি এই মাসটিতেই তা স্পষ্ট প্রমাণিত?
১৮ এপ্রিল’ ২০২৬ তারিখ, একদিনে ১৩ জনের মৃত্যুর কারণ ছিল এই বজ্রপাত। সেদিনের মর্মান্তিক খবরটির একটি সপ্তাহ গেল না! আজ রবিবার (২৬ এপ্রিল’ ২০২৬) আবারও দেশে বয়ে গেল প্রকোট ঝড়বৃষ্টি! বজ্রপাত হয়ে মৃত্যুদূত আজও তান্ডব চালালো বাংলাদেশের কয়েকটি জেলায়। গেল সপ্তাহের মতো আজও বেঘোরে প্রাণ হারালো গ্রামের নিরিহ মানুষেরা। আহা! বজ্রাঘাতে জ্বলন্ত এই মানুষগুলির শিরোনাম হওয়াকে- কোন ভাষায় আমরা প্রকাশ করতে পারি?
“জাতির বিবেক, পুরোপুরি স্তব্ধ হওয়ার কথা ছিল? ভাগ্যাহুতরা ছিলেন কৃষক, জেলে, মজুত শ্রেণীর মানুষ। হয়ত সে কারণেই এতো লাশের জন্য দেশবাসীর বুকটা সেভাবে কেঁপে ওঠে না! মৃত্যুর মিছিলে অংশ নেয়া লাশের পরিবারগুলোর জন্য জাতীয়ভাবেও কখনও কোথাও পালন করা হয়না ১ মিনিট নিরবতা? বজ্রঝর হয়, দেশে প্রকৃতির বিবর্ণ আক্রোশে বজ্রপাত সব ধ্বংস করে দিয়ে যায়, এই নিয়তিই গ্রামের অসহায় মানুষের মেনে নিয়ে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হচ্ছে বছরের পর বছর। বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমানো তো যাচ্ছেই না, ক্রমাগত বেড়েই চলেছে প্রাকৃতিক মরণ মিশালইল বজ্রপাতের হুঙ্কার! ”
গত সপ্তাহের হিসেবে, সুনামগঞ্জ, রংপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জ জেলায় বজ্রপাত অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি আঘাত হেনেছে। সুনামগঞ্জ জেলায় হাওর এলাকায় ফসলের মাঠে ৫ কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও রংপুর ময়মনসিংহে ২ জন করে, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, লালমনিরহাট ও কিশোরগঞ্জে ১ জন মারা যান। আজকের কালবৈশাখী ঝরের সঙ্গে বজ্রাঘাতে গাইবান্ধা, বগুড়া, নাটোরে শিশুসহ ৭ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে। সিরাজগঞ্জে বজ্রপাতে হয়েছে ২ জনের মৃত্যু। জামালপুরে ২ জন ও মুন্সীগঞ্জে ৩ জনের আকস্মিক করুণ মৃত্যুর খবর এসেছে!
দেখা যাচ্ছে, ধানের মৌসুমে বজ্রপাত শুধু যে কৃষকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তা নয়, বজ্রপাত বাড়ির পাশে ধান শুকাতে ব্যস্ত মা বোনদের জন্যও শঙ্কার কারণ ঘটাতে পারে।
হাওর বাওরের নিম্নাঞ্চলে বজ্রপাতে নিহত হওয়ার চেয়ে বেশি ভুগতে হয় আহত ব্যক্তিদের। দেশের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক চিকিৎসা সেবার অবস্থা আরও শোচনীয়। প্রকৃতির সাথে লড়াই করা মানুষেরা বজ্রপাতে আহত হওয়ার পর জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু নিতে এসেও পড়ছেন বেঁচে থাকার আরও এক কঠিন লড়াইতে! চিকিৎসকরা বলছেন, বজ্রপাতে সরাসরি আঘাত প্রাপ্ত রোগী খুব কমই বাঁচেন। আর এ বছর কালবৈশাখীর তান্ডব সবে শুরু। এর ভেতরই ঘটে গেল পর পর দুবার নির্মম বজ্রাঘাত! মেঘ কেটে আকাশ পরিস্কার হয় কিন্তু গ্রামের নিরিহ মানুষের বজ্রপাত নিয়ে বেঁচে থাকার শঙ্কা তবু যে থেকেই গেল? কেননা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে ঝড়বৃষ্টি বজ্রপাত কমতে এখনও মে মাস অবধি দেশবাসীকে সাবধানে থাকতে হবে। অনেকসময় দেখা যায়, আকাশ পরিস্কার, ঝড় বৃষ্টি নেই, মনে হবে অনেক অনেক দুরে মেঘের গর্জন হচ্ছে, যতই বিদুৎ চমকাক না কেন, বজ্রপাত কি হবে? প্রকৃতির অবধারিত এই রূঢ় চরিত্রটি বুঝতেই ঠিক আমরা ভুলটি করে থাকি বারবার। কেননা, প্রকৃতিকে বিশ্বাস করা মানুষগুলোই ঠকে যাচ্ছে বারবার। আমরা কেন বুঝতে চাই না- প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে বজ্রপাত অশনী সংকেতরূপে হাজির হবেই হবে।
যে কয়জন ব্রজাঘাতে আহত হয়েছেন, অনেককেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পরও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বজ্রপাত কেন এ বছর এতোটা প্রবল আকার ধারণ করেছে, বিশেষজ্ঞ মহলকেও গবেষণায় বসার যেন ফুসরত দিচ্ছে না?
বিজ্ঞানীরা অতিমাত্রায় বজ্রপাতের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন।
জনজীবনে যে ভুলগুলোর কারণে মানুষ বজ্রাঘাতের শিকার হচ্ছেন বেশি, এর প্রধান সমস্যা হিসেবে বিশেষজ্ঞরা ‘অজ্ঞতাকে’ বেশি দায়ী করছেন। গ্রামের মানুষ জীবনের চেয়ে কাজকে প্রাধান্য বেশি দিতে গিয়েই বজ্রপাতের কবলে পড়ছেন। অযথাই ঝুঁকির ভেতর মানুষের এ যেন ইচ্ছাকৃত আত্মাহুতি। অনেকে মসজিদে নামাজ পড়তে যান। প্রবলবেগে ঝড় বৃষ্টিতে নামাজ শেষ হলেও মুসুল্লির উচিত মসজিদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা। কিন্তু ফলাফল দেখা যায় বিপরীত। মুসুল্লিরা দ্রুত বাড়িতে যাবার জন্য যেন এক প্রকার দৌঁড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। যা সম্পুর্ণ রকমের ভুল সিদ্ধান্ত। আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ আরও বলছেন, গ্রামের হাওর, বাওর, নদী এলাকায় নিরক্ষর জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস। এই শ্রেণীর জেলেরা আকাশে মেঘের ডাক শুনলেই আর মাছের লোভ সামলাতে পারে না। বাজ পড়বে না ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়বে এসবের ধার ধারে না এই গরীব মৎস্যজীবিরা। আর কৃষক কৃষানীর জীবন আরও নির্মম। এদের জীবন ঝড়ঝনজায় আরও শঙ্কাময়। এই মানুষগুলো নিজের জীবনের চেয়ে গরু ছাগল মহিষের জীবন নিয়ে বেশি উৎকন্ঠায় ভুগে। যার খেসারত দিতে বজ্রপাতে অবধারিত মৃত্যুর ট্রাজেডী ঘটে চলেছে। আজকেও বজ্রপাতে মারা যাওয়া মানুষগুলোর তালিকায় কৃষক পরিবারের সদস্যই বেশি দেখা গেছে। পুরো দেশে বজ্রাঘাত ঘিরে শোকের আবহ তৈরি করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ কালবৈশাখীর বাকী সময়টুকুতে সবাইকে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। অনেকের সচকিত প্রশ্ন, এত ঝড়- এত বজ্রাঘাত-এত মৃত্যু? মানুষ তবু সতর্ক হয় না। সাবধান হয় না। জীবন সম্পর্কে মানুষের উদাসীনতা মানুষকে বজ্রপাতের ঝুঁকিতে ফেলছে অবলীলায়। ‘বজ্রপাত’ নিয়ে সদ্য জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার ও বজ্রপাতে মারা যাওয়া এলাকার এমপিদেরও বলতে শোনা গেছে- “আমরা প্রকৃতির কাছে অসহায়”। মাননীয় সাংসদ প্রতিনিধিদের বজ্রপাত নিয়ে চরম উৎকন্ঠা দেখা গিয়েছে। প্রকৃতির এই নির্মমতাকে হ্রাস করা নিয়ে সংসদ অধিবেশনের আলোচনাটি যেন ঝড়ের মতো হঠাৎ থেমে না যায়, সরকারের কাছে বজ্রপাতে নিহত প্রতিটি পরিবারের এই আবেদনকে অবশ্যই মূল্যায়ণ করতে হবে।
উন্নত বাংলাদেশের কথা মুথে আমরা যতই বলি, সব বুলি… কোন সরকার সাধারণ গ্রামবাসীদের বজ্রপাতের কবল থেকে রক্ষায় কখনও কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বজ্রপাত শুধু একটি প্রাণঘাতী সমস্যা নয়, এটা জননিরাপত্তা বিষয়ক অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা। আমাদের শত শত মানুষ বজ্রাঘাতে মারা যাচ্ছে। বছরে প্রায় ৫০০ জন! কৃষিপ্রধান দেশের জনবল মানে সবুজ বিপ্লবের জন্য যা অপূরণীয় ক্ষতি। উন্নত বিশে^ বজ্রপাত ঠেকাতে নেয়া হয় আধুনিক কর্মব্যবস্থাপনা। ওদের মতো তো আমরাও শুরু করতে পারি- বজ্রপাত পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা নিয়ে ৯৯৯ এর মতো কোন ইমার্জেন্সী কলিংবুথ! এমনকি প্রতিটি জেলায় কৃষক, মৎস্যজীবি, শ্রমিকদের সচেতনতাবোধ তৈরিতে নিতে হবে আরও তড়িৎ পদক্ষেপ। বজ্রপাত নিয়ে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেয়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জেলা পর্যায়ে বজ্রপাত থেকে নিরাপদে থাকার কলা কৌশল শিক্ষাদান। উন্নত বিশে^র মতো প্রযুক্তিকে কার্যবাহী করতে পারলে হয়ত বজ্রপাতের অপঘাত কিছুটা হলেও কমার সম্ভাবনা আছে। আগাম পূর্বাভাস ব্যবস্থাটিও জরুরি। নদীবন্দরগুলোতে যেমন জেলেদের সতর্ক করা হয়, ঝড়বৃষ্টিতেও বজ্রপাতের প্রারম্ভে সতর্ক করার হুইসেল চালু করা যায় কিনা, দেখা দরকার। যদিও আবহাওয়াবিদগণ ২-৪ ঘন্টা আগে ‘নাউকাস্টিং’ প্রযুক্তির কথাটি উল্লেখ করেছেন। এই পক্রিয়াটিও বজ্রপাতের আগাম সংকেত প্রদান করতে সক্ষম। আরও বলা হয়েছে- স্যাটেলাইট তথ্য ও গ্লোবাল লাইটনিং ডিটেকশন সিস্টেমে এটা মানুষকে আগাম সংকেত প্রদান করতে পারবে। এটা নিশ্চিত বলা চলে- প্রযুক্তির এই ছোঁয়া বজ্রপাতের জন্য হুমকীতে থাকা জেলাগুলোতে ছড়িয়ে দিতে পারলে, অসহায় গ্রামবাসীদের মরণঘাতী বজ্রাঘাতের কবল থেকে রক্ষা করা সহজ হবে। গ্রামের শিক্ষিত সমাজকে জনসচেতনা সৃষ্টিতে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি ফসলেম মাঠ, মৎস্যখামার, নদনদীর পাড়, শিশুদের খেলার মাঠসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের আশে পাশে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র অবশ্যই নির্মাণ করতে হবে। প্রয়োজনে প্রযুক্তি ও মেধাবী আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের কাজে লাগাতে হবে। উন্নত দেশে ‘সেইফ এলার্ট’ এ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ডিভাইস দিয়েও ওরা প্রযুক্তির সুফল ভোগ করছে।
একটি বিদেশী গবেষণায় বলা হয়েছে-‘বজ্রপাত প্রকৃতির বড় ধরণের হুমকী হলেও, বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য লোকের ভয়ের কারণ হতে পারে না। বাংলাদেশে এখনও দেখা যায়, বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে লোকজন দেরি করছে। কারণ, অশিক্ষিত গ্রামবাসী অনেকেই বলে থাকেন-‘ওর ঠাডা পড়ছে, ওরে ধরা যাবে না, আমিও মরবো!” এই গবেষণা ভুল প্রমান করছে আমাদের গ্রামবাসীদের। বজ্রাঘাতের পর পরই অভিজ্ঞ নিরাপত্তা রক্ষকদের সহায়তায় দ্রুত আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসকের সরনাপন্ন করাতে হবে।
অযথা বিলম্ব মানেই বজ্রাঘাতে একজন মানুষকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেওয়া।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, অভিযোগনিউজবিডি.কম


